Saturday, June 27, 2020

দাগ কিংবা একটি রাজপুত

দাগ




দাগ

শীশা হো ইয়া দিল হো, আখির টুট যাতা হে । ভেঙে যাওয়াই তার ভবিতব্য । আর  নিশ্চয়ই ভাঙার একটা নিয়ম আছে । অন্ততঃ নিয়ম থাকা অস্বাভাবিক কিছু না । যেভাবে  ক্রমশঃ ভেঙে যাচ্ছে অণু-পরমাণু । ভেঙে যাচ্ছে ধারণা । ভেঙে যাচ্ছে সংসার করতে চাওয়া নিবিড় সম্পর্কেরা । বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ভঙ্গুর বিধেয় । পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ক্রিয়া পদ । সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে । বিশেষ্য একটা অবস্থান থেকে সরে গিয়ে অন্য অবস্থানে সরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে । যেতে যেতে এক্স এক্সিস থেকে ওয়াই এক্সিস,ওয়াই এক্সিস থেকে এক্স । কখনো পজিটিভ, কখনো সে নেগেটিভ মানে ভিন্ন মাত্রার ভিতর অবস্থান করছে সম্পর্কবোধ । যেখানে সময়কে খুব দ্রুত মাত্রায় সরে যেতে দেখে, ভালো ঠাহর হয়না এই খেলা ভাঙার খেলা ।  কি সেই খেলা, কি তার নিয়ম ? কোথায় তার শুরু ?

কিছুই বোধগম্য হলো না । স্টেয়েট ভাবে বললে,  ক্রমাগত দূরে চলে  যাওয়া একটি  ভাঙন প্রক্রিয়া মাত্র ।  সেই দূরত্বের নিশ্চয় মাপজোক আছে । গোল-কাঠি আছে ।  এই এতোটা বয়স পার করে আসা সেই দূরত্বের একক নিয়ে ভাবি । খেলার হারজিতের কথা ভাবি । কে পক্ষ, কে বিপক্ষ জানার আগেই নিজেরা ভেঙে যাচ্ছি দ্রুত । ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে পরস্পরকে নিয়ে এতোটা দূরত্বে আছি যে  সীমানা ভেঙে যাচ্ছে । সংজ্ঞা ভেঙে যাচ্ছে ।  শব্দ ভেঙে যাচ্ছে । ধ্বনি-তরঙ্গে ভেঙে যাচ্ছে ধারণা, শুধু তার প্রক্রিয়া থেকে যাচ্ছে এক ধ্রুবক ।


আরো খানিকটা হেঁয়ালি হয়ে গেলো । যে কথা হচ্ছিলো, নিশ্চয়ই ভাঙনের একটা নিয়ম আছে ।  সেই নিয়ম,  ছন্দ নিয়ে , মাত্রা নিয়ে, স্কেল, ইঞ্চি নিয়ে  ধ্বনি-তরঙ্গের কথা নিয়ে কথা হচ্ছিলো । সম্পর্কের ভেঙে যাবার কথা , ধারণা ভেঙে যাবার কথা যা এক অন্যধারণায় গিয়ে নতুন অবয়ব নিচ্ছে । জুড়ে যাচ্ছে অন্যান্য ডাইমেনশনে ভেঙে যাওয়া অংশবিশেষ ।  আবার বিচ্ছিন্ন ভঙ্গাংশের জোড়াতালিতে রয়ে যাচ্ছে দাগ ।  দাগ আচ্ছে হ্যায়। নব্য ধারণায়  দাগ একটি একটি বিশেষ্য পদ । দাগ মানে জুড়ে থাকা দুটি প্রত্যঙ্গের আবছায়া, কিংবা আলাদা করে সাক্ষর হতে চাওয়া একটা সৃষ্টির বীজ,  তার প্রজনন ও প্রতিপালন নিয়ে কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কিছু রেফারেন্সের কথা আজ বলি ।  একটা খেল্‌ খেলা যাক । আমাদের এই খেলার জন্য চাই একটা গল্প ।

ধরুনঃ 
মধুছন্দা সেনগুপ্ত  একজন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শেষ করা পূর্ণবয়স্ক সাহসী নারী ।  তার মুখমণ্ডলে এক লালিমা,  চাহনিতে চকিত হরিণের বিস্ময় । তার হৃদয় আনকোরা, তার প্রেম-অভিলাষ এক-পবিত্র বিশ্বাস । উঠতি যৌবনআভা তার ব্যক্তিত্বে এনে দিয়েছে এক রমণীয় সৌন্দর্য । তার স্বপ্নের রাজকুমার হলেন সনৎরঞ্জন সমাদ্দার । ক্রিকেট ক্লাব সেক্রেটারি বনেদী যোগেনলাল সমাদ্দারের একমাত্র পুত্র । সনৎরঞ্জন নিজেও একজন তুখোড় খিলাড়ী ।  ব্যাট হাতে যখন মাঠে নামেন, ময়দানের চারপাশে হাততালির বহর ছুটে যায় ।  ছক্কার পরে ছক্কা মেরে যখন ব্যাট তুলে ধরেন, দর্শকদের  ভিতর ওঠে প্রশংসার ঢেউ । অনবদ্য ব্যাটিং করে সনৎরঞ্জন ফিরিয়ে দেন সেই দর্শকের ভালোবাসা । টিমের দলনায়ক হিসাবেও তার ছবি ঘুরছে ফেসবুকের ওয়ালে । এদিকে ফেসবুকের ডাকসাইটে কবি,  স্কুল মাস্টার বেনীমাধব চট্টোপাধ্যায় মধুছন্দাকে ভালোবাসেন । মধুছন্দার প্রেমের অনলে পুড়ে যাওয়া আর সার্থকতা । দরদী প্রেমের কবিতা লিখে চলেছেন প্রতিনিয়ত ।  লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব ম্যাগাজিন জুড়ে তার নিয়মিত উজ্জ্বল উপস্থিতি । ফেসবুকে পোস্ট দিলেই লাইক কামেন্টের বন্যা বয়ে যায় । সাগরিকা ঘোষ একজন মফস্বলের মেয়ে । বেনীমাধবের পাঠক ও ফেসবুক ফ্রেন্ড । বেনীমাধবের কবিতা তার ভালো লাগে, তাকে রেগুলার ফলো করেন । মাঝে মাঝে কামেন্টও করেন ।  ফেসবুকের হার্ট্টথ্রব বেনীমাধব।  বেণীমাধব জানেন যে সাগরিকা তার কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক । একবার বইমেলার স্টলে তাদের দেখা হয়েছে । বেনীমাধবের "হৃদ-মাঝারে নীলপদ্ম" প্রকাশের প্রথম দিনই সেই বইটি কিনেছেন সাগরিকা ঘোষ । তারপর একদিন লুকিয়ে দেখা হলো একটি রেস্টুরেন্টে । বেনীমাধব সাগরিকাকে চুম্বন দিয়েছেন, সাগরিকা স্থির হয়ে শুধু চেয়ে দেখেছেন ।  ঐ পর্যন্তই । সাগরিকা ঘোষ বেনীমাধবের সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন । বেনীমাধব এত কথা জানেন না । তার জনপ্রিয় কবিতাগুলি মধুছন্দাকে নিয়ে লেখা ।  সে জুড়ে যেতে চায় মধুছন্দার প্রেমে । সাগরিকা সে কথা জানেন । সাগরিকা নিম্নবিত্ত, সাগরিকার গায়ে শ্যাম রং । সাগরিকা বোঝেন সে কথা । শুধু এই বয়স, এই মন ও শরীর তার বাগ মানে না । পদ্মার জল স্থির থাকে না , স্রোতের অনুকূলে সময় বয়ে যায় । সময় বড়ই নিরপেক্ষ ।


সেই মতো গৌরচন্দ্রিকা শেষে,  একদিন পাই পাই করে ছুটতে থাকা হিরোহোন্ডা এক্সট্রিম হঠাৎ ব্রেক কষে থামিয়ে সনৎরঞ্জন পাড়ার কলতলায় দাঁড়িয়ে পড়লেন । মধুছন্দা হেঁটে যায় ঐ দেখা যায় । মধুছন্দার চলন, বলন যেন প্রকৃতির কাছে এক শ্যামল সবুজ বাগিচা । রাস্তার যেখানেই মধুছন্দা দাঁড়িয়ে পড়েন, সেখানেই বাগিচায় ফুল ফুটে যায় ।  রঙের বাহার নেমে আসে পৃথিবীর ঘাসে।  যে পাড়া দিয়ে হেঁটে যায়, যেন জ্বলন্ত লাভা ছড়িয়ে যায় । যে কোন যুবক সেই লাভায় পুড়ে যেতে পারেন ।  মধুছন্দার রূপমাধুরী,  চাপা খিলখিল হাসি, সনৎরঞ্জনের ভিতর বক্ষ ফুড়ে মর্মে গিয়ে পৌঁছেছে ।  তার বুকের ভিতর থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে থাকে নিঃশ্বাস  । সনৎরঞ্জন বুঝতে পারেন যে মধুছন্দাকে তিনি ভালোবেসে ফেলেছেন ।  মধুছন্দার ঘন কালো কেশ, আর কাজল কালো আঁখিতে সে খুঁজে পেয়েছে পাখীর নীড় । সুতরাং আজ সে আর দেরী না করে পথ আটকে সে দাঁড়ালো মধুছন্দার।

"এই যে রাজপুত্র , পথ ছাড়ো বাড়ি যাবো । ", মধুছন্দা বললেন ।

"নিশ্চয় যাবে, তার আগে একটা কথা ছিলো ", বললেন সনৎরঞ্জন ।

"কি কথা, তাড়াতাড়ি বলো, আমার বেলা বয়ে যায় ", মধুছন্দা আকুতি করে বললেন ।

"এখানে নয়,  মরা নদীর বাঁকে একটা  চর পড়েছে, কাল সকালে যদি সময় করে আসতে পারো , দুজনে নৌকা করে যাবো ," ।   সনৎরঞ্জন আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলে । মধুছন্দার নিজের কানে একথা বিশ্বাস হয় না । বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে সনৎরঞ্জন বলে যান,  "কাল মসজিদ মোড়ে সকাল এগারোটা নাগাদ দেখা করো,  একা এসো কিন্তু " ।

সেই মতো, মধুছন্দার হৃদয়ে দ্রিমদ্রিম, মুখে ঘর্ম, অগ্নাশয়ে প্রজাপতি দৌড়চ্ছে । বারবার জানলায় নজর,  ফোনের টাচ স্ক্রিনে আঙুল চলে যায় । যদি তার সেই টেলিফোনটা আসে । কি করে ফোন আসবে।  নাম্বারই তো জানে না সনৎরঞ্জন ।   ফোন আসে না, তবে  সনৎরঞ্জন ফেসবুকে একটা ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন ।  মেসেঞ্জারে লিখেছেন সে "হাই" ।  ওদিকে আর একটা নোটিফিকেশন আসে । আরো একটি কবিতা পোস্ট দিয়েছেন বেনীমাধব । নির্ভেজাল পোস্ট । মধুছন্দাকে কোনদিনই সে ট্যাগ করেন না । বিরক্তও করেন না । শুধু কবিতা লিখে ওয়ালে ছেড়ে দেন । প্রেমের কবিতা ।  মধুছন্দা নিজেও কবিতা পছন্দ করেন, অন্ত্যমিল দিয়ে দুএকবার কবিতাও  লিখেছেন কিন্তু  ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়নি কখনো । কিন্তু বেনীমাধবের কবিতাগুলি তার পছন্দ হয়, কবিতাগুলি যে তাকে নিয়েই লেখা তাও কিঞ্চিত আন্দাজ করতে পারেন । কিন্তু কোথাও একটা কিছু ফ্যাক্টর আছে, কোন একটা দূরত্ব আছে যা কোনভাবেই ক্লিক করে না । প্রেমিক হিসাবে বেনীমাধবকে মেনে নেওয়া যায় না । কিন্তু  ড্যাশিং সনৎরঞ্জনের কথাই আলাদা ।  তাকে ঘিরে তার স্বপ্নরাজ্য গড়ে ওঠে । সনৎরঞ্জনের আবির্ভাবে তার চোখে উজালা আর নাকমুখ লালিমায় ভরে যায় ।

জীবনের প্রথম ডেটিং, কাল দুপুরে দেখা হবে মরানদীর চরায় । কি কথা হবে ? কি ভাবে শুরু হবে কথা ? নাকি আদৌ যাওয়া হবে না কাল ? নাকি, ফোনে ফোনে আগে কথা বলে নেবে ? ফেসবুক মেসেঞ্জারে কত লোকের কত কথাই তো হয় । স্নিগ্ধা বোস বিবাহিত, তবু সে সুজয় ঘোড়পাড়ের সঙ্গে মাঝরাত্রি অব্ধি কী কথা বলে । যূথিকা মল্লিক গতকাল রমেশ রায় কে এক্সপোজ করে দিয়েছে । রমেশের মেসেঞ্জারে দেওয়া কু-প্রস্তাবগুলি স্ক্রিনশট দিয়ে  ফেসবুকে পাবলিক করে দিয়েছে । দেবেশ দত্ত আর মল্লিকা দত্তের সদ্যবিবাহের স্ন্যাপশট দিয়েছে ফেসবুকে, দুজনকেই খুব ভালো মানিয়েছে । সনৎরঞ্জনের সঙ্গে তাকে কেমন দেখাবে ?  সনৎরঞ্জনের সঙ্গে কি মধুছন্দা ঘর বাঁধবেন ? এক সেকেন্ডের জন্য বিবাহসজ্জার কথা মনে এলেও, মধুছন্দা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন । তাকে, আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার, সনৎরঞ্জন তাকে সত্যই ভালোবাসেন কি না । কতোটা নিকটের সে  ? নাকি তার অন্য কোন প্রেমিকা আছে ? থাকাটা অসম্ভব কিছু না ।

আর একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও এসেছে আজ ।  রিকোয়েস্টটি সাগরিকা ঘোষের ।  মধুছন্দা তাকে চেনেন না । কিন্তু রিকোয়েস্টটি একটি মহিলা প্রোফাইলের, সুতরাং রিকোয়েস্টটি গ্রহণ করা যায় ।  প্রোফাইল দেখে নিশ্চিত হলেন যে সাগরিকা একটি নারী চরিত্র , ফেক প্রোফাইল নয় । কবিতা লেখেন । বেনীমাধব ও রয়েছেন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড-লিস্টে । বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করলেন মধুছন্দা । সাগরিকার ফেসবুক ওয়াল ঘুরে দেখে এলেন মধুছন্দা, সাগরিকা বাংলাটা পরিপাটি বুনটে লেখেন ।  সেগুলি একটু হতাশার, একটু বিষণ্ণ পঙক্তিমালা ।  সেগুলি প্রেমের কবিতা ঠিক না । তবে বোঝা যায়, ভাষার উপরে তার দখল আছে । ফেসবুক মেসেঞ্জারে তার আর একটি নোটিফিকেশন এলো ।

"হাই" - লিখলেন সাগরিকা ।
"হেলো, আমি কি আপনাকে চিনি ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"না, হয়তো । কিন্তু আমি আপনাকে চিনি" - লিখলেন সাগরিকা ।
"চেনেন ? বাহ , কি জানেন আমার ব্যাপারে ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য" - লিখলেন সাগরিকা ।
"মানে ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"অতিদূর সমুদ্রের ’পর  হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা "  - লিখলেন সাগরিকা ।
"হা, হা, কি যে হেঁয়ালি বলেন,  মরানদীর চরের কথা বলছেন ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর "  - লিখলেন সাগরিকা ।
"পারেন বটে,  আমাদের কি কোথাও দেখা হয়েছে ?  বলুন তো আমি কে ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, এতদিন কোথায় ছিলেন? পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন। " - লিখলেন সাগরিকা ।

হেসে ওঠেন মধুছন্দা । ইমোজি এক্সচেঞ্জ করলেন ।  কিছু  অন্য কথাও হলো ফেসবুক ওয়াল নিয়ে, কে কোথায় ভৌগলিক ভাবে দাঁড়িয়ে, কার কি সামাজিক অবস্থান ।  সাগরিকার এনগেজমেন্ট স্ট্যাটাসটা না জানা হয়নি, প্রোফাইল দেখেও সেটা বোঝা যায় না ।  তবে কথায় কথায়  এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে সাগরিকা একজন কামিটেড প্রেমিকা ।  সে যারই হোক । 

"একটা কথা ছিলো " -  লিখলেন সাগরিকা ।
"বলুন "  - লিখলেন মধুছন্দা ।
"আপনি কবি বেনীমাধবকে চেনেন ? পড়েছেন তার কবিতা ? " - লিখলেন সাগরিকা ।
"কেন বলুন তো ? আপনিও তার ফ্রেন্ড-লিস্টে রয়েছেন " -  লিখলেন মধুছন্দা ।
"না, মানে আপনাকে নিয়েও তো তার কবিতা, আপনিই তার বনলতা সেন " -  লিখলেন সাগরিকা ।
"বটে ! আপনিও হতে পারেন তার বনলতা " -  লিখলেন মধুছন্দা ।
"যদি - পারতাম , দশ বাই দশ ফুট যাপনের পরিধিতে তাকে কি করে ধরি ? এই হৃদয় তবু মানে না ।  এই ওষ্ঠে আবিষ্ট এখনো তার উষ্ণ চুম্বন, আমার শরীর যৌবনে শুধু তার অধিকার " -  লিখলেন সাগরিকা ।

ব্যাপারটা মধুছন্দার কাছে আরও একটু খোলসা হলো । সাগরিকা মনে প্রাণে বেনীমাধবকে চান । তাকে চুম্বন করেছেন বেনীমাধব । সেটা ভুলতে পারেন নি সাগরিকা ।  কথাটা জেনে মধুছন্দার একটু হিংসেও হচ্ছিলো । বেনীমাধবকে নিয়ে যদিও মধুছন্দা নিজে কোন স্ট্যান্ড নেয় নি । তবু সাগরিকার মতো একটা সাধারণ মেয়ে যার সঙ্গে নাকি আজই পরিচয় , সে জানাচ্ছে বেনীমাধবের উপর তার  অধিকারের কথা ?  একটু বিরক্তও হলো । বিরক্তিটা গোপন রেখে, কয়েকটি ইমোজি ছেড়ে দিয়ে মেসেঞ্জার থেকে বাই বাই করে দিলেন সাগরিকাকে । তবে একটা ভয় তার কাটলো ।  মরা নদীর চরের কাল ডেটিং এর কথাটা এখনো গোপন রয়েছে , সে আর সনৎরঞ্জন ছাড়া এই কথা কেউ জানেন না । সুতরাং এইসব ভার্চুয়াল কথোপকথনকে ছেড়ে কাল সশরীরে জীবনের প্রথম ডেটিংএ যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন । 


কথাটি মধুছন্দার মা, মালতীদেবী জানতেন না । মধুছন্দা ডেটিংএ যাবেন ।  মেয়েকে ডেকে বললেন এদিক ওদিক কোথাও না বের হতে । আজ শুক্লাপঞ্চমী ।  বিকালের দিকে এক সভ্রান্ত পরিবার তাকে দেখতে আসবেন। মালতীদেবী ভাবেন, মধুছন্দা যদিও এখন পড়াশোনা করছে, তবুও যদি ভালো সম্পর্ক আসে, তবে কন্যাদান করে দেবেন । মধুছন্দা জানেন এই মেয়ে দেখার মানে । তাড়াতাড়ি বিদায় দেওয়ার ফন্দি তার পিতা মাতার  ।  বিবাহের ব্যাপারে এখনই আগ্রহী নয় জানিয়ে আসমানী রঙের সালোয়ার কামিজে 'এই দুপুরের দিকে চলে আসবো' বলে মসজিদ মোড়ের দিকে বের হলেন । আজ ঘরের চৌকাঠ পার হবার সময় তার মনে হচ্ছিল, লক্ষণ রেখা কোথাও ভেঙে গিয়েছে । তিনি নিজেই ভেঙে দিয়েছেন । কে জানে কে তাকে দেখতে আসবে , সে নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই ।

যথারীতি, চোখে সরু ফ্রেমের রেব্যান সানগ্লাস পরে বাইকের উপরে ঠ্যাং দুলিয়ে মধুছন্দার স্বপ্নের রাজকুমার সনৎরঞ্জন সমাদ্দার মসজিদ মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন ।  আজ মধুছন্দা একা, সাহসী রাজকন্যা । এই প্রথম সনৎরঞ্জনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন  মধুছন্দা । তার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, লজ্জাও ঘিরেছে তার বক্ষ । খানিকক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, আশেপাশের শ্যামল, বায়ু, আকাশ তাকিয়ে সেই যুগলমিলন দেখলো । এক অনন্ত আকর্ষণের কাছে এসে ধরা পড়েছে দুটি মেরু । দুটি সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য পদ, দুজনকেই চায় । এখানে প্রেমভাবকে যদি এক্স এক্সিস বরাবার প্লট করা যায়, দুজনই পজিটিভ । আবার সম্পর্ককে যদি ওয়াই এক্সিস বরাবর প্লট করা যায় । দুজনই পজিটিভ । দূরত্বের হিসাবে, দুজনই একই দিক কোয়াড্রেনে (১) অবস্থান করছেন ।  হিরোহোন্ডা এক্সট্রিমের পিলিয়ন রাইডার হিসাবে মধুছন্দার আজ প্রথম অভিজ্ঞতা । বুক কেঁপে ওঠে  তার । পিছনের সিটে বসিয়ে মধুছন্দাকে বসিয়ে উল্লাসে থরথর পক্ষীরাজের ঘোড়া উডিয়ে দিলেন রাজকুমার সনৎরঞ্জন । রাস্তার উপর যেন রঙ্গীন ফুল বিছিয়ে দিয়েছে কেউ , শানাই বাজছে যেন রাস্তার দুপাশে । স্বপ্নরাজ্যের সুবাস এসে মৃদুমন্দে আঘাত করে করে চলেছে নাসিকারন্ধ্র । মরানদীর সোঁতায় এসে একটা নৌকা বাঁধা আছে । বাইকটি পার্কিংএ রেখে যুগোলকিশোর সেই নৌকাভ্রমণে দ্রুতই পৌঁছালেন মরা নদীর চরে । পরিপার্শ্বে কোন মনুষ্য-প্রজাতির দেখা নেই । এই নির্জনে তবু নদীর ভাঙ্গন স্পষ্ট দেখা যায় । নদীর এপার ভাঙ্গে তো ওপারে চর জেগে ওঠে । এইখানটা পরস্পরের চোখে চোখ ডুবিয়ে অনন্ত বসা যায় দুজনে । হাতের মুঠোতে ধরে রাখা মধুছন্দার হাত নিয়ে সনৎরঞ্জন নদীর বাঁধের কিনারায় চলে আসেন । নদীর প্রতিচ্ছবি মধুছন্দার চোখের ভিতর ঝিলিক মেরে ওঠে । পায়ের নিচে নরম মাটি , এখনো পাড় শুকায়নি ভালো করে । টাল সামাল দেওয়া কঠিন ।  সনৎরঞ্জন খিলাড়ি মানুষ । সুঠাম শরীর, যেমন বাইসেপস, তেমন ট্রাই সেপস । বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরেন মধুছন্দাকে । প্রথম ডেটেই এতটা শারীরিক হয়ে ওঠা আশা করেননি মধুছন্দা । তবু,এই এত নিকটে আসাতে তার নিজের সম্মতি রয়েছে। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠার আগে, তার কিছু প্রশ্নের জিজ্ঞাসার তাই এখুনিই প্রয়োজন ।  কথাগুলি জিজ্ঞাসা করা যাক ।

"যে কথা তোমার বলার ছিলো, কিছু বলো " - বললেন মধুছন্দা ।
"কি কথা ? " - বললেন সনৎরঞ্জন ।
"ঐ যে গতকাল কলতলায় বললে, যে কারণে আমায় এখানে ডেকেছো " - বললেন মধুছন্দা । 
"এইযে দেখেছো কাঁচা মাটি, এখানে আমাদের গ্রাম ছিলো , আমাদের পরিবার, তোমাদের পরিবার । সবটাই নদীর পেটে, আমরা এই গ্রামে জন্মেছি, গ্রামটা ভেঙে গেছে " - বললেন সনৎরঞ্জন ।
"না , এ কথা না ।  আমার  পথ আটকে তুমি যেকথাটা গতকাল বলেছিলে , নাকি একটা কথা আছে " - বললেন মধুছন্দা ।
"হ্যাঁ সেটাই তো বলছি, আমার ঠাকুরদা ছিলেন গ্রামের মোড়ল, তোমার ঠাকুরদার বন্ধুস্থানীয়, খুব নিকটের । দুই প্রজন্ম আগে আমরা নিকটে ছিলাম, এক প্রজন্ম আগে আমরা দূরে চলে যাই "- সনৎরঞ্জন বললেন ।
"আচ্ছা, সোজাসুজি,  একটা কথা বলো । তুমি কি আমায় ভালোবাসো, তিন সত্যি করে বলো ।  কি ভালোবাসো ? " - জিজ্ঞাসা বললেন মধুছন্দা ।
"হ্যা, অবশ্যই ।  খুবই ভালোবাসি । এই আকাশ, এই নদী, এই চর সাক্ষী,  আই লাভ ইউউউ " - দুহাত উঁচু করে বললেন সনৎরঞ্জন ।
"কতোটা ভালোবাসো " - চমকিত চোখে যেন বারিধারা চলে আসে । উত্তাল বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করে উঠলেন মধুছন্দা ।
"এই  এত্তোটা "  বলে সনৎরঞ্জন দুহাত বাড়িয়ে দেখালেন ।

তারপর মধুছন্দাকে ধরে উঁচু করে কোলের উপর তুলে নিলেন । মধুছন্দার মুখের মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন মুখ । বুকের ভিতর পিষে দিলেন বুক । মধুছন্দা বুঝতে পারছেন । পায়ের নিচে মাটি কাঁচা, পা সরে যাচ্ছে । ভেঙে যাচ্ছে মাটি । সনৎরঞ্জনের বুকের ভিতর একটা আশ্রয় আছে । তাকে আসতে হচ্ছে তার বুকের ভিতরে । আসাটা এতো সহসা ও জরুরী ছিলো না, সেটা তার চাওয়াও ছিলো না ।  এইতো চিরাচরিত জনশ্রুতি । যৌবনের জোয়ারে নদীর পার ভেসে যায় ।  মধুছন্দা নিজেও উজাড় হয়ে গেলেন । বুভুক্ষু সনৎরঞ্জনের কামনার তাপে মধুছন্দার দুপুর পুড়ে গেলো । সনৎরঞ্জন তাকে কতোটা ভালোবাসেন , তার একটা পরিমাপ করার চেষ্টা করছিলেন মধুছন্দা । গ্রাম,সেন্টিমিটার,তারিখ যা কিছু পরিমাপ যোগ্য, তার মাত্রায় ।   ভালোবাসার আকার , আয়তন , রং , রস, ঘ্রাণ কিছুই যার সংজ্ঞাবদ্ধ নয়, কি ভাবে সেই সম্পর্ককে পরিমাপ করা যায় ? কতটা ভালোবাসা হলে অবলীলায় আত্মসমর্পণ করা যায় ? এক্স এক্সিস যত কাছে আসুক, ওয়াই এক্সিসের একটা দূরত্বে পড়েছে।  মধুছন্দা একটি স্ট্যান্ড নিয়ে ফেললেন মনে মনে ।  বিষণ্ণ বিকেল ফুরানোর আগে  তিনি ফিরে এলেন জিরো জিরোতে । যেখানে এক্স , ওয়াই আয়নহীন ভাবে নিরপেক্ষ  । অর্থাৎ নিজ আলয়ে ।   

পৃথিবীর সব পাখি ঘরে আসে । মধুছন্দাও এলেন ।  'মেয়ে দেখা'র অভিপ্রায়ে আসা অতিথিগণ এখনো তাদের বাড়িতে অবস্থান করছেন । অতিথিগণ কোয়াড্রেন-২ থেকে এসেছেন ।  কনে'কে তারা দেখেই যাবেন । কনে'র আসতে দেরী হচ্ছে বলে , তারা অপেক্ষা করলেন । মধুছন্দা সাহসী নারী, কিন্তু আজ  একটা চোরা ভাঙ্গন তার ভিতরে দেখা গেলো । তিনি  ভাঙ্গছেন, তবু ভেঙে পড়ছেন না । মলিন সালোয়ার, কামিজ ওড়না পালটিয়ে ,বাথরুম থেকে স্নান সেরে , অতিথিদের সামনে আসার জন্য প্রস্তুত হলেন । একটা রিং বাজলো । ফোনে একটা নোটিফিকেশন ঢুকলো । মেসেঞ্জার খুলে দেখলেন তিনি । সনৎরঞ্জন , মধুছন্দা ও তার যুগলমিলনের একটি সেলফি পাঠিয়েছেন । নিচে লিখেছেন । "আই লাভ ইউ, লাভ ইউ ভেরি মাচ" । মধুছন্দা একটি লম্বা নিঃশ্বাস নিলেন । কিছু ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ এলো । মেসেজটি ডিলিট করে মধুছন্দা ফোন অফ করে দিলেন । ডিলিটের নীচে যদিও রয়ে গেল একটা দাগ । দাগ, আচ্ছে হে।  অতিথিদের অনেকক্ষণ নিশ্চয় আটকে রাখা হয়েছে । তাদেরকে একবার দেখা দেবার দরকার ।

চা, নাস্তা হয়ে গেছে একপাটি । গল্প জুড়ে দিয়েছেন অতিথিগণ । দু-পরিবারে লোকজনই জমে গেছেন । এ পর্যায়ে কোয়াড্রেন-২ তে থাকা অতিথিদের কেউ নিশ্চয় তিনি এক্স পজিটিভ নন । কিন্তু তারা ওয়াই নেগেটিভও নন । এতক্ষণে মধুছন্দা বুঝে গেছেন,  নিকট মানেই এক্স এক্সিস নয় । সময়ের সমতলে, এক্সিস নিজেই বদলে যায় । আশ্চার্য,  দেখতে আসা মানুষটিকেও মধুছন্দা চিনতে পারলেন ।  তিনি আর কেউ নন স্বয়ং  বেনীমাধব ভট্টাচার্য । মধুছন্দা নির্দ্বিধায় তার নিকটে এসে পড়লেন । সেখানে কবি বেনীমাধব তাকে ভালোবাসেন কি না, কতো পরিমাণ ভালোবাসেন সেই প্রশ্ন অবান্তর ।

গল্পটি, এখানেই শেষ করা যেতো ।  ভালোবাসার বা নিকটে আসার পরিমাপ যোগ্য কোন ইউনিটের সন্ধান এইগল্পের চরিত্র দিতে পারলো না ।  কিন্তু ভাঙ্গন যে একটি সত্য তা উপলব্ধি করলাম । দাগের অস্তিত্ব নিয়েও আমরা ধারনা পেলাম । দাগ নিয়ে আমাদের কোন বিতর্ক নেই । কিন্তু একটি দাগকে লিপিবদ্ধ করা একটা কঠিন সমীকরণ । দাগ শুধুমাত্র ভেঙে যাওয়ার চিহ্ন নয় । দাগ হতে পারে জোড়া লাগারও । অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে যেটা এক্স এক্সিসে দূরত্ব মনে হচ্ছিলো, সেটা ওয়াই এক্সিসে নিকটে চলে আসতেই পারে । অ্যাসিমেট্রিক ইউনিট ।  এক অন্য ডাইমেনশনে ।  সেইভাবে, নিকটে আসা মানেই নিকটে নয় । বুকের ধকধককে তাই আর সংজ্ঞাবদ্ধ করা যাচ্ছে না । অথচ দুটি সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য পদের দূরত্ব নিয়ে যদি ভাবি , ক্রমবর্ধমান দুটিরেখার বিপ্রতীপ কোণে অবস্থান করছে চারটি কোয়াড্রান । সমমাত্রার পজিটিভ ও  সমমাত্রা নেগেটিভ স্বভবতই কাছে চলে আসে ।
সেই পরিণাম নিয়ে  তুমিও একগাছা দড়ি নিয়ে অশ্বত্থের কাছে গেছো ।  সে প্রতিবাদ করেছে তবুও আকাশচুম্বনকে ধরতে পারো নি ।  বিশ্বাস করোনি তাকে।  চুম্বনকে এক্স এক্সিসে ধরে যতই নিকটে আসতে চেয়েছো,  ওয়াই এক্সিস বরাবর ততটাই  আকাশ দূরত্বে সরে গেছে  । গণিতের সত্য হিসাবে দায়ী হতেই পারে একটি মাত্র ভাঙন, একই এক্সিসে একই দূরত্বে থেকেও মধুছন্দার কোঅর্ডিনেটে সনৎরঞ্জন নেগেটিভ হয়ে গেছিলেন । আর একটি দাগ হয়ে যেতে পারে জোড়া লাগার চিহ্ন । আপেল কে পেয়ারা দিয়ে যদিও কোনদিন বিভাজ্য করা যায় নি তবুও কোয়াড্রেন-১ থেকে নিজেকে কোয়াড্রেন-৪এ চলে যেতে দেখলেন সনৎরঞ্জন সমাদ্দার ।

এতকিছু সত্বেও, আর একটি প্রভাত আসে । ফেসবুকে নোটিফিকেশন আসতে থাকে । ফেসবুকে নোটিফিকেশন এসেছে,  সাগরিকা ঘোষকে ট্যাগ করে পোস্ট দিয়েছেন মধুছন্দা সেনগুপ্তা ।  দুই পরিবারের মিলনের কিছু ছবিসহ দেওয়া হয়েছে বেণীমাধব ও মধুছন্দার আসন্ন পরিণয়ের আগাম সংবাদ । ফেসবুক একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া । এখানে কে সত্য, কে সাহসী, কে লোভী , কে ধূর্ত এই নিয়ে কানাঘুষো ঘমাসান জারী থাকে। অশ্বত্থের শাখা এতটা বিশ্বস্ত নাও হতে পার ।  তার বিশ্বাসও হতে পারে ভঙ্গুর । কত আর সে প্রতিবাদ করবে ।  এইজীবন তার বেনীমাধব ছাড়া মিথ্যা জানা সত্বেও সাগরিকার জীবন থেকে বেনীমাধবকে এক ঝটকায় মধুছন্দা আলাদা করে দিলেন । ফেসবুকে তার এনগেজমেন্টের পাবলিক ঘোষণা দিয়ে সাগরিকার কল্পনার বাসরশয্যায় ঢেলে দিলেন শীতলজল । এই পিতামাতার অভাবী সংসারে সেলাই দিদিমণি সাগরিকা ঘোষ কি আর করতে পারেন ?  যে সাগরিকা এই গেমের প্রথম  থেকেই কোয়াড্রেন-২ এ অবস্থান করছিলেন, ফেসবুকের এক পোস্টেই কোয়াড্রন-৩এ পিছলে গেলেন । অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয়, আরো এক বিপন্ন বিস্ময় । একটি অজানা ভাঙনে হটাৎ তার ওয়াই এক্সিস নেগেটিভ হয়ে গেলো ।  এক্স এক্সিস আগেই নেগেটিভ ছিলো তার । এই নষ্ট মেয়ের ভূমিকায় কবিতা লিখতে অসহ্য লাগছে আজ । অক্ষরবৃত্তের শব্দাবলী থেকে যেন তার মাত্রা পতিত হচ্ছে । তার কবিতা মিলছে না ।  কোয়াড্রেন-৩ এক পৈশাচিক ভিরানা ।  ডিপ্রেশনের কোয়াড্রেন । সেখানে সবাই সবার থেকে দূরে অবস্থান করেন । একলা হয়ে যাওয়ার আগে বিপর্যস্ত চোখের সামনে তার পরিত্রাতার ভূমিকায় আচমকাই যেন বলিউড হিরো সুশান্ত সিং রাজপুত এসে দাঁড়ালেন । সাগরিকা ঘোষ তার চোখে চোখ রাখলেন । একটা প্রশান্তি ।  লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলেন ।  একটা চেয়ার টেনে নিয়ে , একগাছা দড়ি নিলেন হাতে ।  সিলিং ফ্যানের কাছে তার ছিলো এই শেষ নিবেদন । ঝুলে পড়লেন সাগরিকা ঘোষ । এই কবিতা জীবনের মোহ ভেঙে অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি দিলেন সাগরিকা ঘোষ । রেখে গেলেন একটি দাগ ।  যে দাগ না জোড়ার, যে দাগ না ভাঙার । পরিমাপযোগ্যতার বাইরে বিষাদবিধুর সেই দাগ । 


No comments:

Post a Comment