Tuesday, January 24, 2023

মনিকাঞ্চনমালা

মনিকাঞ্চনমালা

 

--পীযূষকান্তি বিশ্বাস

 

বার তিনেক অসফল প্রয়াসের পর জয়েন্ট এন্ট্রান্স টেস্টে বসা ছেড়ে দিলো শ্রীকান্ত । শ্রী শ্রীকান্ত লাহিড়ী । বছর আঠারোর সুঠাম দিল্লি কে কড়ক লন্ডা । প্রতিদিন দৌড়ে যাওয়া এই মর্মর দিল্লির বুকে রাফ এন্ড টাফ জীবনযাত্রা, প্রতিযোগিতার উচ্চ শিখরে পৌঁছাবার অনন্য রাস্তা হলো ভালো কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করা । তা হলো না । এই মেট্রোলাইফে প্রতিপদে এক সংগ্রাম, প্রতিদিনই এক নতুন মনখারাপ । যেকোনো মুহূর্তে আপন চিত্তের থেকে যাপনের ছন্দ কেটে যাবে । যদি না আপনি বিত্তশালী হন । শাহজানাবাদ দিল্লি শহরে মাতুল শ্রী অভিজিৎ দোস্তিদার  মস্ত বড় সফল সিভিল আর্কিটেক্ট । তার বাড়িতেই মানুষ শ্রীকান্ত। 

 

এই জয়েন্ট এন্ট্রাস ব্যাপারটা বড় গোলমেলে । প্লাস-টুতে অনেক নাম্বার নিয়েও উতরানো সম্ভব হয়ে ওঠে না । ফ্রাস্ট্রেশন আসে । ব্যর্থতার পদে পদে মিশে থাকে গ্লানি, কৈশোর যেন পার হতেই চায় না । এদিকে গলিতে গলিতে কোচিং সেন্টারআকাশ , অক্সফোর্ড, অমুকদাদা, তমুক দাদার অনেক অনেক টিউশনি ক্লাস খুলে গেছে । সে সব অনেক অনেক খরচা , বাবার কাছে টাকা চাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা । মামাকেও বলে উঠতে পারেনি ।  মনে মনে সে ভেবেই নিয়েছে এই পর্যন্তই তার দৌড় । ক্লাস শেষ করে এবার নিজের ক্লাসে ফিরে যাবার দিন । মনেপ্রাণে আজকাল  সে একটা চাকরীর কথাই ভাবছে । মোটামুটি একটা চাকরী পেলে সে আলাদা ভাড়াঘর নিয়ে চলে যাবে । গ্রাম থেকে বাবাকে নিয়ে এসে কাছে থাকবে । বাবা গ্রামে একা হয়ে গেছেন আজকাল ।  শ্রীকান্ত যখন  প্রাইমারী স্কুলে, মায়ের অকাল মৃত্যুতে পিতা পরেশনাথ লাহিড়ী পুত্রকে মানুষ করতে  হিমশিম খাচ্ছেন, নিঃসন্তান মামী রত্না দোস্তিদার  লাহিড়ী শ্রীকান্তকে নিজের ছেলে মতো আপন করে নেন । মাতুল, অভিজিৎ দোস্তিদার  শ্রীকান্তকেও  স্কুলে ভর্তি করে দিলেন । পরেশনাথ লাহিড়ী আর বিবাহ করলেন না । হাসনাবাদের এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন ।  শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়ে এখন ফুলটাইম সাহিত্যচর্চা করেন । কবিতা লেখেন । শিল্পী মানুষ । তার কিছু বই বেরিয়েছে, পাঠকও আছে । কিন্তু ওনার শরীর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছে না । ব্লাড প্রেশার ও সুগারটা মাত্রারিক্ত বাড়ন্ত ।  

 

শ্রীকান্ত ভাবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে । প্লেন গ্রাজুয়েট নিয়ে কি করা যায় ? । সরকারী চাকরীর কথা ভাবে শ্রীকান্ত । এদিক ওদিক ইন্টারভিউ দিয়ে বেড়াচ্ছে । বন্ধুরা কিছু না কিছু করছে । দাঁড়িয়েও যাচ্ছে । এই তো রবিপ্রসাদ সাক্সেনা এবছর ব্যাংক পিও হয়ে দেরাদুন চলে গিয়েছে । বান্টু সিং ওর কাছের বন্ধু । ওরও মার্চেন্ট নেভি হয়ে গেলো এ বছর । দীপিকা মালহোত্রা বি এড করছে । বেশ সুন্দর দেখতে । বেশ পছন্দ হয় তাকে ।  কয়েকবার ডেট করেছে । বুদ্ধাগার্ডেন , লোধীগার্ডেন, পুরানাকিলায় বেশ ঘোরাঘুরি করেছে । যার চাকরী নেই তার একটা গার্লফ্রেণ্ড আছে , জিনিসটা ঠিক খোদার ও পছন্দ না । যে কোন সময় ছুটে যেতে পারে ছোকরি ।  

 

 

শ্রীকান্ত ভাবে তার জীবন কাহিনী নিয়ে । দীপিকাকে নিয়ে কি করা যায় ? আচমকা পিওন একদিন একটা লম্বা খামে চিঠি দিয়ে গেলো । খুলে দেখে অবাক ! অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ! যোধপুরে আরকিওলজি ডিপার্টমেন্টে ওর চাকরী হয়ে গেছে । ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখলো শ্রীকান্ত । খুশীর জোয়ার তার চোখে মুখে । মামা অভিজিৎ দোস্তিদার কে দেখালো চিঠিটা । উনি গম্ভীর সুরে বললেন, 'ঠিক আছে' । মামা আশা করেছিলেন ভাগ্নে মস্ত বড় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হবেন ।  বাবার সঙ্গেও ফোন কথা বললো শ্রীকান্ত । বাবা খুবই উচ্ছ্বসিত । ফোনেই কেঁদে ফেলল । ছেলের জন্য কিছু একটা না করতে পারার তাড়নায় পরেশনাথ লাহিড়ীর বহু কেঁদেছে, চোখে জল আসেনি । আজ ফুঁপিয়ে কাদলো বাবা । সেতো ছেলের কাছেই থাকতে চায় । সারা জীবন কিছু দিয়ে যেতে পারলো না, তার সাহিত্যকর্মের কিছুটা উত্তরাধিকারী হিসাবে ছেলেকে দিয়ে যেতে চায় । যদি কোনদিন শ্রীকান্ত তার বাবার সাহিত্য কর্মের কিছুটা আঁচ পায়, জীবন তার সার্থক মনে হবে । এমনিতেই আজকাল আর কবিদের কেউ ডাকে খোঁজে না । ছেলের কাছে থাকতে পারবে বলে পরেশনাথ লাহিড়ী মনে মনে একটু স্বস্তি পায় । পরেশনাথ লাহিড়ী চেয়েছিলেন ছেলে মস্ত একজন আর্টিস্ট হোক , একটু শিল্পী মনের হোক ।

 

সেই রকম পাকাপাকি ভাবে যোধপুরে চলে এলো শ্রীকান্ত । সরকারী চাকরী ।  কাজে সে ভালো । মন লাগিয়ে কাজ করে । কাজের জন্য তাকে বিভিন্ন মনুমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, ঐতিহাসিক স্পটে যেতে হয় মেহরানগড় ফোর্ট রাঠোড়দের রাজ্য , ফুল মহল, তু্রজি কা ঝালারা  । অনেক বিদেশী গুণাগ্রহীদের সঙ্গে রাজপুতনার ইতিহাস নিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয় । ভারতীয় শিল্প ও ভাষ্কর্ষের নানা দিক হাইলাইট করতে হয়, কিভাবে প্রত্যেকটা ছবি বা মনুমেন্ট কিভাবে ভারতীয় হয়ে উঠেছে সেই নিয়ে নানান যুক্তি সে খাঁড়া করে । এখন নানান বিষয়ে থিসিস লিখতে হচ্ছে । নানান দেশ থেকে ডেলিগেটস আসে । সবাই ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল শিল্পের গুনাগ্রাহী । এই সমস্ত নিয়ে খুবই একঘেয়েমী ।   কিন্তু প্রতিদিন সেই এক কাজ, এক কথা, মনে মনে শ্রীকান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে । এই ঐতিহাসিক শহর তাকে মূর্তির মতই স্থবির করে দিয়েছে ।  যান্ত্রিক বানিয়ে দিয়েছে তার চেতনা ।  কোন কিলা, কোন মকবুরা যেন নিরেট পাথর ছাড়া আর কিছু না । আলো আছে , ক্যামেরা আছে, ডলার ভ্যালু আছেপ্রাণ নেই কোথাও । এই এতসব দিনরাত বকবকের মাঝে তার কোন শিল্প নজরে আসে না, মনে হইয় কোথাও যেন কিছু একটা মিসিং । দিন কে দিন দায়িত্ব বেড়ে যায় কিন্তু কোথাও যেন মনে হয় এখানেও মন লাগছে না । কাজকর্মের ভিতর সে ডুবে যেতে চায় আজকাল । প্রাচ্যের স্থাপত্য নিয়ে নতুন পেপার লিখতে হবে । রাতজুড়ে শ্রীকান্ত ইতিহাসের পাতা জুড়ে দৌড়ে বেড়ায় । বাবার ফোন আসে । বাবাকে ফোন করে, মামীর ফোন আসে । সময়মত খেয়ে নেওয়ার কথা বলে । কুশল বিনিময় হয় । শ্রীকান্ত জানায় যে সে ভালো আছে । কিন্তু প্রতিদিন ওই একই কথাবার্তা চলতে থাকে । সমস্তটাই স্টিরিওটাইপের । বান্টুর ফোনও কম আসে । দীপিকার ফোন আসে না আর । ফেসবুকে আপডেট দিয়েছে। তার একজন পাঞ্জাবী প্রেমিক জুটেছে । কদিন হলো ফোনে ফোনেই ব্রেক-আপ হয়ে গেলো । দীপিকার মধ্যে ওর মাকে কিছুটা খুঁজে পেতো শ্রীকান্ত । জীবন থেকে তার মায়ের ছোঁয়া এই মুহূর্তে অবলুপ্ত হয়ে গেলো । এই প্রথম মনে হলো শ্রীকান্তের জীবনটা বড়ই একটা শূন্য । ব্যর্থ হতে হতে সে যেন একটা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । 

 

 সেদিন রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় । তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে । হয়তো মার কথাই সে ভাবছিলো । অথবা কোন স্বপ্নের কথা । মোবাইল তুলে বাবাকে ফোন করলো । বাবা ফোন তুললেন না । ফোন বেজে গেলো । ঘণ্টা খানেক পরেই বড় মামার কল এলো । দুঃসংবাদ । বাবা পরেশনাথ লাহিড়ী আর পৃথিবীতে নেই । কি করতে হবে জানা নেই, হতভম্ব হয়ে গেলো শ্রীকান্ত ।  

 

 

ভোরের ফ্লাইটেই কলকাতা চলল শ্রীকান্ত । হিসাব তো কিছু নেই, কি মিলছে ,কি মিলবে । মামা মামীও কিছুক্ষণ পরে কলকাতা পৌঁছাবে । হাসনাবাদে পৌঁছে গেলো শ্রীকান্ত, চেনা পরিচিত লোকজন কিঞ্চিৎ, দিল্লিতে মানুষ হবার কারণে বাল্যবন্ধুও কেউ এখানে নেই । বাবা দোতলায় একা থাকতেন । ম্যাসিভ হার্ট এটাক । হাসপাতালে যাওয়ার সময় পায় নি পরেশনাথ লাহিড়ী । চারিদিকে বই খাতা ছড়ানো । লেখালেখি করছিলেন হয়তো । এই বছর তার একটি কবিতার বই বেরোনোর কথা ছিলো । সাহিত্য চর্চা করতেন , পাড়ায় এদিক ওদিক মানুষকে ধরে কবিতা শোনাতেন । বুকস্টলে বসে, বুড়ীর চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিয়ে হাসিমুখে তার দিন কাটতো ।  আজ একা পড়ে আছেন । মানুষতো একাই আসে,  একাই যায় । শ্রীকান্ত কিছু ভাবতে পারলেন না । ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন । চোখে জল এলো না । কতবার সে বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছে, বাবাই মানা করে দিয়েছে । তাকে বড় হতে হবে, মামার কথা মতো চলতে হবে । আজ তার কেন যেন মনে হলো এই সংসার সম্পূর্ণটাই তার জন্য মৃত । এই মনুষ্য জীবন তার পুরোপুরি অনর্থক । ব্যর্থ জীবনের এই ভার তার চরম অসহ্য বোধ হতে লাগলো । চোখে কোন জলই এলো না । হতভম্বের মত সে চোখে অনুভব করলো জলশূন্যতা ।   

 

শ্রাদ্ধের কাজকর্ম সেরে যোধপুর ফিরে এলেন শ্রীকান্ত । ইদানীং কাজের চাপ কম । আকবরের মকবুরায় ঐ কৃষ্ণা দ্বাদশীর চাঁদ দেখা যায় । পাশে ছোট বড় উজ্জ্বল ও অনুজ্জ্বল নক্ষত্র । কাজে মন লাগে না আর । এই শহর, এই ভাষ্কর্ষ , চিত্র, মনুমেন্ট থেকে দূরে যেতে চায় । মনে হয় হাসনাবাদের দিকে চলে যায় । অফিসের বড় বাবুও বলছিলেন 'শ্রীকান্ত্‌জী আপ এক লম্বা ছুট্টি লে লিজিয়ে' । কিন্তু আসলে সে হাসনাবাদের দিকেও যেতে চায় না । বাবার চিতার ছবির সামনে সে বারবার এসে দাঁড়াতে চায় না । কিন্তু ছুটিতো নেওয়াই যায় । গুগলে ম্যাপ দেখে ঠিক করলেন কোন নির্জন জায়গায় যাবেন যেখানে খানিকটা একা হওয়া যায় । সৃষ্টিকর্তা যেখানে ব্যস্ত নন । কিছু প্রশ্ন তাকে রাখা যায় । অবসরে নিজের হারানো পরিবারের ব্যথায় কিছুটা কান্না করা যায় । কিছুতেই চোখে জল আসে না । মরুভূমি , সমতল, সমুদ্র থেকে তার পাহাড়ি এলাকা পছন্দ হলো । এমনিতে ধর্ম চর্চা বা মন্দিরে বেশী তার নেই তা স্বত্বেও আজ কেন জানি তার মনে হলো হিমালয়ের কোলে কোন মন্দিরে গিয়ে দুদিন কাটায় । 

 

সেই মত ইন্টারনেট খুঁজে সে হিমাচল প্রদেশের টিকিট কেটে ফেলল । জায়গা হিসাবে ঠাণ্ডা ও নির্জন সে 'কাজা' শহরে এসে একটা মোটামুটি হোটেলে ঘর নিলো । কাজা একটা পাহাড়ি গ্রাম, লাহুল ও স্পীতি জেলায় । সপ্তাহ খানেক এখানেই থাকতে চায় শ্রীকান্ত । এখানে জানতে পারলো কিছু বৌদ্ধ মনেস্ট্রি আছে , খুব শান্ত ও নির্জন পরিবেশ ।

 

যাত্রা হিসাবে এই প্রথম নয়, তবুও ঘুরতে যাওয়া হয়তো এই প্রথম । এবং একা । বন্ধু বান্ধব পরিজন বর্জিত।  এই প্রথম উদ্দেশ্যহীনতাকে সে অনুভব করলো শ্রীকান্ত । জীবনের ধুকপুক কে সে তার বুকের খুব কাছে টের পেলো, এই প্রথম সে বুঝতে পারলো শিরশিরে ঠাণ্ডা বাতাস তার জামার আস্তিনে ঢুকে যাচ্ছে । চোখজুড়ে জলশূন্যতা আর পায়ে পাহাড়ির গ্রামের ডাক । একে একে পাহাড় পেরিয়ে যাচ্ছে, সবুজের প্রলেপ করে দিগন্ত শেষ হয়ে আসছে । চারিদিকে বরফের স্তূপ সরিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি চলেছে আর্মির ট্রাক । তিব্বতের দিকে চলে যাচ্ছে ওরা । অনিশ্চয়তা ঘিরে আছে অসম্ভব স্থিরতা নিয়ে, স্বাভাবিকতা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে । মেঘহীন জীবন কারো জন্য অপেক্ষা করেনা এখানে । হোটেল টাইগার ডেন , থ্রি স্টার । বেশ সাজানো গোছানো । বুঝতে পারলো শ্রীকান্ত যে এখানে সে নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছে । কিন্তু যতটুকু নিঃশ্বাস সে নিচ্ছে তার এক শ-শতাংশ খাঁটি । সে এখানে প্রিয়জনের বিয়োগ ভুলতে চায় , পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে খুঁজতে চায় । আবিষ্কার করতে চায় জীবনের প্রাসঙ্গিকতা । আজ এখনো সূর্য অস্ত যেতে ঘণ্টা খানেক বাকি । হোটেল থেকে বেরিয়ে খানিকটা ঘুরে আসতে চাইলো শ্রীকান্ত । কিছু খবরাখবর করতে চায় , কোথায় কাছাকাছি কি আছে চটজলদি জেনে নেওয়া ভালো । এখানে টুরিস্টদের ভিড় । গ্রুপে এসেছে সবাই । দোকান পাঠে শহুরে মানুষদের ভিড় । শ্রীকান্তের পছন্দ পাহাড়ি মানুষদের সাথে কথা বলা । স্থানীয়দের সাথে সে আলাপ করতে চায় । 

 

একটু খিদে পেয়েছে বুঝলো শ্রীকান্ত , এখানে খাদ্য বলতে ম্যাগীর চলাচল । শুকনো খাবার । অনেকদিন জমিয়ে রাখা যায় । সেইখানে ম্যাগী খেতে খেতে দোকানীকে জিজ্ঞাসা করলো দেখার কি কি আছে । দোকানীও জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনে নিলো কোথা থেকে এসেছে, কোন হোটেলে উঠেছে । সেই মত তাকে অনেক জায়গা ও কিভাবে যাওয়া যাবে তা জানিয়ে দিলো । পরামর্শ দিলো, একটা গাইড নিলে সে সমস্তটাই ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে ।

 

হোটেল থেকে এমন একটা গাড়ি দিয়েছে । ড্রাইভার নিজেই গাইডের কাজ করবে । তার বাড়ি কাজাতেই । কাছাকাছিই তার গ্রাম । গ্রামের বাড়িতে রোজিরোজগারের তেমন ব্যবস্থা নেই । টুরিস্টই ভরসা । বাইরে থেকে টুরিস্ট এলে তাদের জীবিকা চলে । শীতের সময় বরফ জমে যায় , টুরিস্ট কম আসে । যেটুকু ইনকাম এই গরমের সময় । জিজ্ঞাসা করতে ড্রাইভার তার নাম জানালো রাজু । রাজকুমার ঠাকুর । সে মনিবের গাড়ি চালায় ।

 

এই কদিন বেশ ঘোরাঘুরি হলো । নানান রকমের কথা, কাহিনী, রূপকথার দেশ এই কাজা । বেশ কেটে গেলো কয়েকটা দিন রাজুর সহচর্যে । কাল দিল্লি ফিরে যাবে শ্রীকান্ত । এই কদিনে সে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইছে, কিন্তু কেন জানি মনে হলো কিছুটা বাকি রয়ে গেল । আজ তার জার্নির শেষ দিন । যাত্রা শুরু হলো ভোরে । সকালে কিছু খাওয়া হলো না । রাস্তায় কোথাও খেয়ে নেবে স্থির করলো । সুনীল আকাশের নীচে এক বিশাল দেহ নিয়ে এক একটা পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে । স্পিতি নদীর মনোরম জলে এই প্রথম নিজের ছবি দেখতে পেলো শ্রীকান্ত । কি প্রশান্তি । তার কোন বন্ধু , পরিবার, সমাজের দরকার আছে কি ? সে নিজেই একটি সমাজ, নিজেই নিজের পরিবার, নিজেই নিজের বন্ধু । নদীর ঝরনায় পা ডুবিয়ে দিলো শ্রীকান্ত । প্রকৃতির মাঝে সে বুঝতে পারলো এক রহস্যময়তা । রাজু বলে চলল পাহাড়ের ইতিহাস , শহরের ইতিহাস , নদীর উৎসের কথা , বরফ ও জলের যুগলবন্দীর কাহিনী । রাজু বলল । এখানে একটা বুদ্ধ মন্দির আছে । যাবেন কিনা ।  শ্রীকান্ত তো এখানেই যেতে চেয়েছিলো । কী মোনাস্ট্রি । পাহাড়ি গ্রামের মাঝে মধ্যযুগের নানা স্থাপত্যের নিদর্শন দেখে চমৎকৃত হলো । তার মনে নানান জিজ্ঞাসা । পেশার কারণে সে ইতিহাসকে জানা শুরু করেছে । আজ একটা জায়গায় দেখলো কয়েকটা বড় বড় পাথর প্রায় একই আকৃতির, কেমন যেন কোথাও একটা সিমেট্রি আছে । একটা প্যাটার্ন যেন বার বার রিপিট হচ্ছে ।  পাথরে এমন একটা শিল্প নিদর্শন দেখে থমকে দাঁড়ালো । এই পাথর প্রাকৃতিক নয় । এই তো শিল্পীমনের বহিঃপ্রকাশ । রাজুকে জিজ্ঞাসা করলো এই পাথর কোথা থেকে এলো

 

রাজুর এই সব স্থান নখদর্পণে । এখানেই তার জন্ম, এখানেই তার বেড়ে ওঠা । এখানকার গল্প কথা, পাহাড়ি কাহিনী শুনে শুনে ঘুম পাড়িয়েছে তার দাদীমারা । রাজু বলল, "কয়েক হাজার বছর আগে এখানে এক রাজা থাকতেন, এখানে গাছপালা ভরা ছিলো । অনেক জংগল ছিলো । রাজা খুব অত্যাচারী ছিলেন । একদিন দুপুর বেলা । রাজার দশ বছরের মেয়ে মনিকাঞ্চনমালা নদীতে নুড়ি কুড়চ্ছিলেন । হঠাৎ বৃষ্টি । আকাশ ঘনকরে বিদ্যুৎ । বাজ-পড়ে এই জঙ্গলে আগুন লেগে যায় । পর্বতের উপরে থাকতেন এক বুদ্ধ সন্ন্যাসী । তিনি বিপদ বুঝতে পেরে ওখান থেকে একটা বড় পাথর ফেলে দেন । বরফের ঢল নেমে আসে । আগুন তো বুজে যায়, মানুষজন বেঁচে যান । কিন্তু এই অবসরে রাজার মেয়ে মনিকাঞ্চনমালা বরফের প্রবাহে বিলীন হয়ে যায় । ওই পাহাড় থেকে নেমে আসা এই পাথরগুলোকে খামোশ করে দেওয়ার জন্য রাজার নির্দেশে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে ধরে নিয়ে আসা হয় । আর এই পাথরগুলো দিয়ে বন্দী বানানো হয় । সেই থেকে এই পাথরগুলো কোথাও যায় নি  "  

 

রাজুর গল্প শেষ হয়, কিন্তু নানান ভাবে মনের এদিক ওদিকে প্রশ্ন জেগে ওঠে । রাজার কথা, ইতিহাসের কথা, ছোট্ট মেয়ের জীবন শংকার কথা, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কথা । ভাষ্কর্ষের দারুণ নিদর্শনগুলি কেন জানি নিষ্প্রাণ হয় । হয়তো তার ভিতর কোন দর্দ খুঁজে পায়না শ্রীকান্ত । এই কয় বছরে চাকরী করতে করতে তার যোধপুরের সমস্ত মনুমেন্টের সন, তারিখ, খরচাসব ইতিহাসই তার মুখস্থ । রাজপুতানার রাজা মহারাজাদের শিল্প পরিচর্যার সমস্ত ভূগোল তার মুখস্থ । সে বলে দিতে পারে সমস্ত হিসাব । এর ভাষ্কর্ষের মধ্যে সে শিল্প খুঁজে পায় না । কোন দর্দ নেই, কোন কাহিনী তার হৃদয়ে কোন করুণ রসের উদ্রেক করে না । আজ কেন জানি তার বুকের ভিতর প্রথম ধাক্কা এলো । শিল্পের কোন এক ছোঁয়ার রং তার চিন্তা প্রদেশে লাগছে । ভাবতে থাকলো শ্রীকান্ত , এত বছর ইতিহাসের কথা, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কথা, রাজার হারিয়ে যাওয়া কন্যা মনিকাঞ্চনমালার কথা । ঈশ, সেই মেয়েটার কি হলো । ছোট্ট মেয়েটা দেখতে খুব রাজকন্যার মত ছিলো । ছিলো কি, ও তো রাজকন্যাই ছিলো । রূপকথা আর ইতিহাস অনেকটা এক, গল্পের মতোই । যতক্ষণ না তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, শ্রীকান্তের মনে সেটা শিল্পের ঝংকার বলে মনে হয় না । 

   

দুপুর গড়িয়ে পাহাড়ে বিকেল নামছে । গ্রাম জুড়ে অনেক মানুষ । ভাবা যায় এখানে বছরের অর্ধেকটা সময় ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে ? রাজধানী থেকে বহুদূর এই গ্রাম । জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য একাডেমী, দাদা সাহেব ফালকে, ফিল্ম ফেয়ার কোনদিন এখানে আলোচনা হয় না, এই সব গল্প এদের জানা নেই । পাহাড়ি জড়িবুটির আর দেশী ইলাজে দিব্বি এদের দীর্ঘ শীতকাল কেটে যায় । গরম কাল আসে । বরফ গলে যায় । জীবন যাত্রায় বিদেশী লোক ঢুকে পড়ে । ইকোনমি এই ভাবে চলে এদের । আজ ফিরে যাবার আগে শেষ দিন । রাজুর সারাদিন কথা ও কাহিনী শুনে সে ক্লান্ত । পেটে একটু খিদের আঁচ পাচ্ছে । কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা দেখা যাক । বিকেলের আলো আর কিছুক্ষণ পরেই মিলিয়ে যাবে । অন্ধকার নামবে সারা পাহাড় জুড়ে । রাজুর দিকে তাকালো । হোটেলের কাছাকাছি এসে রাজুকে ছেড়ে দিল । এইটুকু সে হেঁটে যাবে । 

 

সারাদিনের ঘটনার একটা সারাংশ তার মাথার মধ্যে ঘুরছে, সেইগুলোকে একটা আকার দিতে চায় শ্রীকান্ত । খিদেটা জ্বালাচ্ছে । রাস্তায় একটা চায়ের দোকান । ছোট টিন দিয়ে ঘেরা, গাছের গুড়ি দিয়ে বসার জায়গা । বলল "চায়ে মিলেগা" ? "মিলেগা সাব" জবাব এলো দোকানদারের । ব্যাগটা নামিয়ে দাঁড়াল শ্রীকান্ত । হাতের ক্যামেরাটা অন করলো শ্রীকান্ত । কিছু কিছু শট একবার চেক করে নেবে । চা দোকানকে লক্ষ্য করে ছবি তুলল । এই হয়তো এই যাত্রার শেষ ছবি, এই প্রকৃতি আর শিল্পকলার ভিতর পাহাড়ি জীবনযাত্রা একটা নতুন উৎসাহের দিক খুলে দিতে পারে । বাবার কথা মনে আসছে শ্রীকান্তের । শিল্পী মানুষ ছিলেন । হয়তো এইখানে এলে কিছু নতুন কবিতা লিখতেন । ভিতরে চা করছেন একজন পাহাড়ি মহিলা । বিকালের আলো এসে পড়েছে পাহাড়ের গায় । এখানে কাস্টোমার বলতে শ্রীকান্ত একা । গরম চায়ের গন্ধ আসছে । চা রেডি । ট্রেতে কাপ শুদ্ধু চা বসিয়ে একটা বছর দশেকের একটা মেয়ে এগিয়ে এলো । খালি পা, নাকে নথণী, পাহাড়ি মেয়ে, সাজপোশাক পাহাড়ি । বছর দশেক হবে, কিংবা এগারো । প্রকৃতির কন্যা । তার হাত থেকে চা টা হাতে তুলে নিয়ে শ্রীকান্ত  জিজ্ঞাসা করলো "ক্যা নাম হে তুমহারা "? কোন ভাবনাচিন্তা ও আড়ষ্টতা না দেখিয়ে স্বাভাবিক আওয়াজে মেয়েটি চোখ তুলে উত্তর স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর দিলো  "মনিকাঞ্চনমালা" ।

 

ধপ করে বসে পড়লো শ্রীকান্ত । অ্যাঁ । কি শুনতে পাচ্ছে সে ? কোথাও যেন বাজ পড়লো ।  "মনিকাঞ্চনমালা" । শব্দটি উচ্চারণ হবার সংগে সংগে বারবার পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে । কানের ভিতরে বারবার গুনগুণ করে উঠছে তার আম্লপিফাইড ভার্সন । নিউরোনে অচানক একটা ঝড় । এই তো সেই হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যা । চায়ের প্লেট ধরে অপরূপ পাহাড়ি তনয়া তার সামনে এক অলীক দর্শনের উপলব্ধি । এ যেন প্রাণের পরশ নিয়ে এলো অযুত খোঁজের সারাংশ । এ এক জীবন্ত প্রতিমা আর শাশ্বত রূপের অবিসংবাদী মিথ । বুঝতে পারছে শ্রীকান্ত, তার মেরুদণ্ড দিয়ে প্রচণ্ড বেগে লোহিত রক্তকণারা ছুটে চলেছে । অবারিত ঝর্নায় প্রবাহিত হচ্ছে স্পিতি নদীর কুলুকুলু কলোধ্বনি । ক্লান্ত মুখের অভিব্যক্তি চঞ্চল, শ্রীকান্তের চোখে নরম হয়ে ভিজে আসছে কান্না ।  বাঁধ ভেঙে নামছে অশ্রুর বন্যা । মনিকাঞ্চনমালার মুখাবয়বে মধ্যে শিল্পবোধের উচ্ছল ঢেউ, বাদামী চোখের সোনালী ধারায় পাহাড়ি বিকেল যেন ঝকমকিয়ে উঠছে ।

 

 

 

 

 

 

 

      

 

Saturday, June 27, 2020

দাগ কিংবা একটি রাজপুত

দাগ




দাগ

শীশা হো ইয়া দিল হো, আখির টুট যাতা হে । ভেঙে যাওয়াই তার ভবিতব্য । আর  নিশ্চয়ই ভাঙার একটা নিয়ম আছে । অন্ততঃ নিয়ম থাকা অস্বাভাবিক কিছু না । যেভাবে  ক্রমশঃ ভেঙে যাচ্ছে অণু-পরমাণু । ভেঙে যাচ্ছে ধারণা । ভেঙে যাচ্ছে সংসার করতে চাওয়া নিবিড় সম্পর্কেরা । বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ভঙ্গুর বিধেয় । পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ক্রিয়া পদ । সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে । বিশেষ্য একটা অবস্থান থেকে সরে গিয়ে অন্য অবস্থানে সরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে । যেতে যেতে এক্স এক্সিস থেকে ওয়াই এক্সিস,ওয়াই এক্সিস থেকে এক্স । কখনো পজিটিভ, কখনো সে নেগেটিভ মানে ভিন্ন মাত্রার ভিতর অবস্থান করছে সম্পর্কবোধ । যেখানে সময়কে খুব দ্রুত মাত্রায় সরে যেতে দেখে, ভালো ঠাহর হয়না এই খেলা ভাঙার খেলা ।  কি সেই খেলা, কি তার নিয়ম ? কোথায় তার শুরু ?

কিছুই বোধগম্য হলো না । স্টেয়েট ভাবে বললে,  ক্রমাগত দূরে চলে  যাওয়া একটি  ভাঙন প্রক্রিয়া মাত্র ।  সেই দূরত্বের নিশ্চয় মাপজোক আছে । গোল-কাঠি আছে ।  এই এতোটা বয়স পার করে আসা সেই দূরত্বের একক নিয়ে ভাবি । খেলার হারজিতের কথা ভাবি । কে পক্ষ, কে বিপক্ষ জানার আগেই নিজেরা ভেঙে যাচ্ছি দ্রুত । ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে পরস্পরকে নিয়ে এতোটা দূরত্বে আছি যে  সীমানা ভেঙে যাচ্ছে । সংজ্ঞা ভেঙে যাচ্ছে ।  শব্দ ভেঙে যাচ্ছে । ধ্বনি-তরঙ্গে ভেঙে যাচ্ছে ধারণা, শুধু তার প্রক্রিয়া থেকে যাচ্ছে এক ধ্রুবক ।


আরো খানিকটা হেঁয়ালি হয়ে গেলো । যে কথা হচ্ছিলো, নিশ্চয়ই ভাঙনের একটা নিয়ম আছে ।  সেই নিয়ম,  ছন্দ নিয়ে , মাত্রা নিয়ে, স্কেল, ইঞ্চি নিয়ে  ধ্বনি-তরঙ্গের কথা নিয়ে কথা হচ্ছিলো । সম্পর্কের ভেঙে যাবার কথা , ধারণা ভেঙে যাবার কথা যা এক অন্যধারণায় গিয়ে নতুন অবয়ব নিচ্ছে । জুড়ে যাচ্ছে অন্যান্য ডাইমেনশনে ভেঙে যাওয়া অংশবিশেষ ।  আবার বিচ্ছিন্ন ভঙ্গাংশের জোড়াতালিতে রয়ে যাচ্ছে দাগ ।  দাগ আচ্ছে হ্যায়। নব্য ধারণায়  দাগ একটি একটি বিশেষ্য পদ । দাগ মানে জুড়ে থাকা দুটি প্রত্যঙ্গের আবছায়া, কিংবা আলাদা করে সাক্ষর হতে চাওয়া একটা সৃষ্টির বীজ,  তার প্রজনন ও প্রতিপালন নিয়ে কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কিছু রেফারেন্সের কথা আজ বলি ।  একটা খেল্‌ খেলা যাক । আমাদের এই খেলার জন্য চাই একটা গল্প ।

ধরুনঃ 
মধুছন্দা সেনগুপ্ত  একজন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শেষ করা পূর্ণবয়স্ক সাহসী নারী ।  তার মুখমণ্ডলে এক লালিমা,  চাহনিতে চকিত হরিণের বিস্ময় । তার হৃদয় আনকোরা, তার প্রেম-অভিলাষ এক-পবিত্র বিশ্বাস । উঠতি যৌবনআভা তার ব্যক্তিত্বে এনে দিয়েছে এক রমণীয় সৌন্দর্য । তার স্বপ্নের রাজকুমার হলেন সনৎরঞ্জন সমাদ্দার । ক্রিকেট ক্লাব সেক্রেটারি বনেদী যোগেনলাল সমাদ্দারের একমাত্র পুত্র । সনৎরঞ্জন নিজেও একজন তুখোড় খিলাড়ী ।  ব্যাট হাতে যখন মাঠে নামেন, ময়দানের চারপাশে হাততালির বহর ছুটে যায় ।  ছক্কার পরে ছক্কা মেরে যখন ব্যাট তুলে ধরেন, দর্শকদের  ভিতর ওঠে প্রশংসার ঢেউ । অনবদ্য ব্যাটিং করে সনৎরঞ্জন ফিরিয়ে দেন সেই দর্শকের ভালোবাসা । টিমের দলনায়ক হিসাবেও তার ছবি ঘুরছে ফেসবুকের ওয়ালে । এদিকে ফেসবুকের ডাকসাইটে কবি,  স্কুল মাস্টার বেনীমাধব চট্টোপাধ্যায় মধুছন্দাকে ভালোবাসেন । মধুছন্দার প্রেমের অনলে পুড়ে যাওয়া আর সার্থকতা । দরদী প্রেমের কবিতা লিখে চলেছেন প্রতিনিয়ত ।  লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব ম্যাগাজিন জুড়ে তার নিয়মিত উজ্জ্বল উপস্থিতি । ফেসবুকে পোস্ট দিলেই লাইক কামেন্টের বন্যা বয়ে যায় । সাগরিকা ঘোষ একজন মফস্বলের মেয়ে । বেনীমাধবের পাঠক ও ফেসবুক ফ্রেন্ড । বেনীমাধবের কবিতা তার ভালো লাগে, তাকে রেগুলার ফলো করেন । মাঝে মাঝে কামেন্টও করেন ।  ফেসবুকের হার্ট্টথ্রব বেনীমাধব।  বেণীমাধব জানেন যে সাগরিকা তার কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক । একবার বইমেলার স্টলে তাদের দেখা হয়েছে । বেনীমাধবের "হৃদ-মাঝারে নীলপদ্ম" প্রকাশের প্রথম দিনই সেই বইটি কিনেছেন সাগরিকা ঘোষ । তারপর একদিন লুকিয়ে দেখা হলো একটি রেস্টুরেন্টে । বেনীমাধব সাগরিকাকে চুম্বন দিয়েছেন, সাগরিকা স্থির হয়ে শুধু চেয়ে দেখেছেন ।  ঐ পর্যন্তই । সাগরিকা ঘোষ বেনীমাধবের সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন । বেনীমাধব এত কথা জানেন না । তার জনপ্রিয় কবিতাগুলি মধুছন্দাকে নিয়ে লেখা ।  সে জুড়ে যেতে চায় মধুছন্দার প্রেমে । সাগরিকা সে কথা জানেন । সাগরিকা নিম্নবিত্ত, সাগরিকার গায়ে শ্যাম রং । সাগরিকা বোঝেন সে কথা । শুধু এই বয়স, এই মন ও শরীর তার বাগ মানে না । পদ্মার জল স্থির থাকে না , স্রোতের অনুকূলে সময় বয়ে যায় । সময় বড়ই নিরপেক্ষ ।


সেই মতো গৌরচন্দ্রিকা শেষে,  একদিন পাই পাই করে ছুটতে থাকা হিরোহোন্ডা এক্সট্রিম হঠাৎ ব্রেক কষে থামিয়ে সনৎরঞ্জন পাড়ার কলতলায় দাঁড়িয়ে পড়লেন । মধুছন্দা হেঁটে যায় ঐ দেখা যায় । মধুছন্দার চলন, বলন যেন প্রকৃতির কাছে এক শ্যামল সবুজ বাগিচা । রাস্তার যেখানেই মধুছন্দা দাঁড়িয়ে পড়েন, সেখানেই বাগিচায় ফুল ফুটে যায় ।  রঙের বাহার নেমে আসে পৃথিবীর ঘাসে।  যে পাড়া দিয়ে হেঁটে যায়, যেন জ্বলন্ত লাভা ছড়িয়ে যায় । যে কোন যুবক সেই লাভায় পুড়ে যেতে পারেন ।  মধুছন্দার রূপমাধুরী,  চাপা খিলখিল হাসি, সনৎরঞ্জনের ভিতর বক্ষ ফুড়ে মর্মে গিয়ে পৌঁছেছে ।  তার বুকের ভিতর থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে থাকে নিঃশ্বাস  । সনৎরঞ্জন বুঝতে পারেন যে মধুছন্দাকে তিনি ভালোবেসে ফেলেছেন ।  মধুছন্দার ঘন কালো কেশ, আর কাজল কালো আঁখিতে সে খুঁজে পেয়েছে পাখীর নীড় । সুতরাং আজ সে আর দেরী না করে পথ আটকে সে দাঁড়ালো মধুছন্দার।

"এই যে রাজপুত্র , পথ ছাড়ো বাড়ি যাবো । ", মধুছন্দা বললেন ।

"নিশ্চয় যাবে, তার আগে একটা কথা ছিলো ", বললেন সনৎরঞ্জন ।

"কি কথা, তাড়াতাড়ি বলো, আমার বেলা বয়ে যায় ", মধুছন্দা আকুতি করে বললেন ।

"এখানে নয়,  মরা নদীর বাঁকে একটা  চর পড়েছে, কাল সকালে যদি সময় করে আসতে পারো , দুজনে নৌকা করে যাবো ," ।   সনৎরঞ্জন আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলে । মধুছন্দার নিজের কানে একথা বিশ্বাস হয় না । বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে সনৎরঞ্জন বলে যান,  "কাল মসজিদ মোড়ে সকাল এগারোটা নাগাদ দেখা করো,  একা এসো কিন্তু " ।

সেই মতো, মধুছন্দার হৃদয়ে দ্রিমদ্রিম, মুখে ঘর্ম, অগ্নাশয়ে প্রজাপতি দৌড়চ্ছে । বারবার জানলায় নজর,  ফোনের টাচ স্ক্রিনে আঙুল চলে যায় । যদি তার সেই টেলিফোনটা আসে । কি করে ফোন আসবে।  নাম্বারই তো জানে না সনৎরঞ্জন ।   ফোন আসে না, তবে  সনৎরঞ্জন ফেসবুকে একটা ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন ।  মেসেঞ্জারে লিখেছেন সে "হাই" ।  ওদিকে আর একটা নোটিফিকেশন আসে । আরো একটি কবিতা পোস্ট দিয়েছেন বেনীমাধব । নির্ভেজাল পোস্ট । মধুছন্দাকে কোনদিনই সে ট্যাগ করেন না । বিরক্তও করেন না । শুধু কবিতা লিখে ওয়ালে ছেড়ে দেন । প্রেমের কবিতা ।  মধুছন্দা নিজেও কবিতা পছন্দ করেন, অন্ত্যমিল দিয়ে দুএকবার কবিতাও  লিখেছেন কিন্তু  ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়নি কখনো । কিন্তু বেনীমাধবের কবিতাগুলি তার পছন্দ হয়, কবিতাগুলি যে তাকে নিয়েই লেখা তাও কিঞ্চিত আন্দাজ করতে পারেন । কিন্তু কোথাও একটা কিছু ফ্যাক্টর আছে, কোন একটা দূরত্ব আছে যা কোনভাবেই ক্লিক করে না । প্রেমিক হিসাবে বেনীমাধবকে মেনে নেওয়া যায় না । কিন্তু  ড্যাশিং সনৎরঞ্জনের কথাই আলাদা ।  তাকে ঘিরে তার স্বপ্নরাজ্য গড়ে ওঠে । সনৎরঞ্জনের আবির্ভাবে তার চোখে উজালা আর নাকমুখ লালিমায় ভরে যায় ।

জীবনের প্রথম ডেটিং, কাল দুপুরে দেখা হবে মরানদীর চরায় । কি কথা হবে ? কি ভাবে শুরু হবে কথা ? নাকি আদৌ যাওয়া হবে না কাল ? নাকি, ফোনে ফোনে আগে কথা বলে নেবে ? ফেসবুক মেসেঞ্জারে কত লোকের কত কথাই তো হয় । স্নিগ্ধা বোস বিবাহিত, তবু সে সুজয় ঘোড়পাড়ের সঙ্গে মাঝরাত্রি অব্ধি কী কথা বলে । যূথিকা মল্লিক গতকাল রমেশ রায় কে এক্সপোজ করে দিয়েছে । রমেশের মেসেঞ্জারে দেওয়া কু-প্রস্তাবগুলি স্ক্রিনশট দিয়ে  ফেসবুকে পাবলিক করে দিয়েছে । দেবেশ দত্ত আর মল্লিকা দত্তের সদ্যবিবাহের স্ন্যাপশট দিয়েছে ফেসবুকে, দুজনকেই খুব ভালো মানিয়েছে । সনৎরঞ্জনের সঙ্গে তাকে কেমন দেখাবে ?  সনৎরঞ্জনের সঙ্গে কি মধুছন্দা ঘর বাঁধবেন ? এক সেকেন্ডের জন্য বিবাহসজ্জার কথা মনে এলেও, মধুছন্দা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন । তাকে, আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার, সনৎরঞ্জন তাকে সত্যই ভালোবাসেন কি না । কতোটা নিকটের সে  ? নাকি তার অন্য কোন প্রেমিকা আছে ? থাকাটা অসম্ভব কিছু না ।

আর একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও এসেছে আজ ।  রিকোয়েস্টটি সাগরিকা ঘোষের ।  মধুছন্দা তাকে চেনেন না । কিন্তু রিকোয়েস্টটি একটি মহিলা প্রোফাইলের, সুতরাং রিকোয়েস্টটি গ্রহণ করা যায় ।  প্রোফাইল দেখে নিশ্চিত হলেন যে সাগরিকা একটি নারী চরিত্র , ফেক প্রোফাইল নয় । কবিতা লেখেন । বেনীমাধব ও রয়েছেন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড-লিস্টে । বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করলেন মধুছন্দা । সাগরিকার ফেসবুক ওয়াল ঘুরে দেখে এলেন মধুছন্দা, সাগরিকা বাংলাটা পরিপাটি বুনটে লেখেন ।  সেগুলি একটু হতাশার, একটু বিষণ্ণ পঙক্তিমালা ।  সেগুলি প্রেমের কবিতা ঠিক না । তবে বোঝা যায়, ভাষার উপরে তার দখল আছে । ফেসবুক মেসেঞ্জারে তার আর একটি নোটিফিকেশন এলো ।

"হাই" - লিখলেন সাগরিকা ।
"হেলো, আমি কি আপনাকে চিনি ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"না, হয়তো । কিন্তু আমি আপনাকে চিনি" - লিখলেন সাগরিকা ।
"চেনেন ? বাহ , কি জানেন আমার ব্যাপারে ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য" - লিখলেন সাগরিকা ।
"মানে ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"অতিদূর সমুদ্রের ’পর  হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা "  - লিখলেন সাগরিকা ।
"হা, হা, কি যে হেঁয়ালি বলেন,  মরানদীর চরের কথা বলছেন ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর "  - লিখলেন সাগরিকা ।
"পারেন বটে,  আমাদের কি কোথাও দেখা হয়েছে ?  বলুন তো আমি কে ? " - লিখলেন মধুছন্দা ।
"তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, এতদিন কোথায় ছিলেন? পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন। " - লিখলেন সাগরিকা ।

হেসে ওঠেন মধুছন্দা । ইমোজি এক্সচেঞ্জ করলেন ।  কিছু  অন্য কথাও হলো ফেসবুক ওয়াল নিয়ে, কে কোথায় ভৌগলিক ভাবে দাঁড়িয়ে, কার কি সামাজিক অবস্থান ।  সাগরিকার এনগেজমেন্ট স্ট্যাটাসটা না জানা হয়নি, প্রোফাইল দেখেও সেটা বোঝা যায় না ।  তবে কথায় কথায়  এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে সাগরিকা একজন কামিটেড প্রেমিকা ।  সে যারই হোক । 

"একটা কথা ছিলো " -  লিখলেন সাগরিকা ।
"বলুন "  - লিখলেন মধুছন্দা ।
"আপনি কবি বেনীমাধবকে চেনেন ? পড়েছেন তার কবিতা ? " - লিখলেন সাগরিকা ।
"কেন বলুন তো ? আপনিও তার ফ্রেন্ড-লিস্টে রয়েছেন " -  লিখলেন মধুছন্দা ।
"না, মানে আপনাকে নিয়েও তো তার কবিতা, আপনিই তার বনলতা সেন " -  লিখলেন সাগরিকা ।
"বটে ! আপনিও হতে পারেন তার বনলতা " -  লিখলেন মধুছন্দা ।
"যদি - পারতাম , দশ বাই দশ ফুট যাপনের পরিধিতে তাকে কি করে ধরি ? এই হৃদয় তবু মানে না ।  এই ওষ্ঠে আবিষ্ট এখনো তার উষ্ণ চুম্বন, আমার শরীর যৌবনে শুধু তার অধিকার " -  লিখলেন সাগরিকা ।

ব্যাপারটা মধুছন্দার কাছে আরও একটু খোলসা হলো । সাগরিকা মনে প্রাণে বেনীমাধবকে চান । তাকে চুম্বন করেছেন বেনীমাধব । সেটা ভুলতে পারেন নি সাগরিকা ।  কথাটা জেনে মধুছন্দার একটু হিংসেও হচ্ছিলো । বেনীমাধবকে নিয়ে যদিও মধুছন্দা নিজে কোন স্ট্যান্ড নেয় নি । তবু সাগরিকার মতো একটা সাধারণ মেয়ে যার সঙ্গে নাকি আজই পরিচয় , সে জানাচ্ছে বেনীমাধবের উপর তার  অধিকারের কথা ?  একটু বিরক্তও হলো । বিরক্তিটা গোপন রেখে, কয়েকটি ইমোজি ছেড়ে দিয়ে মেসেঞ্জার থেকে বাই বাই করে দিলেন সাগরিকাকে । তবে একটা ভয় তার কাটলো ।  মরা নদীর চরের কাল ডেটিং এর কথাটা এখনো গোপন রয়েছে , সে আর সনৎরঞ্জন ছাড়া এই কথা কেউ জানেন না । সুতরাং এইসব ভার্চুয়াল কথোপকথনকে ছেড়ে কাল সশরীরে জীবনের প্রথম ডেটিংএ যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন । 


কথাটি মধুছন্দার মা, মালতীদেবী জানতেন না । মধুছন্দা ডেটিংএ যাবেন ।  মেয়েকে ডেকে বললেন এদিক ওদিক কোথাও না বের হতে । আজ শুক্লাপঞ্চমী ।  বিকালের দিকে এক সভ্রান্ত পরিবার তাকে দেখতে আসবেন। মালতীদেবী ভাবেন, মধুছন্দা যদিও এখন পড়াশোনা করছে, তবুও যদি ভালো সম্পর্ক আসে, তবে কন্যাদান করে দেবেন । মধুছন্দা জানেন এই মেয়ে দেখার মানে । তাড়াতাড়ি বিদায় দেওয়ার ফন্দি তার পিতা মাতার  ।  বিবাহের ব্যাপারে এখনই আগ্রহী নয় জানিয়ে আসমানী রঙের সালোয়ার কামিজে 'এই দুপুরের দিকে চলে আসবো' বলে মসজিদ মোড়ের দিকে বের হলেন । আজ ঘরের চৌকাঠ পার হবার সময় তার মনে হচ্ছিল, লক্ষণ রেখা কোথাও ভেঙে গিয়েছে । তিনি নিজেই ভেঙে দিয়েছেন । কে জানে কে তাকে দেখতে আসবে , সে নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই ।

যথারীতি, চোখে সরু ফ্রেমের রেব্যান সানগ্লাস পরে বাইকের উপরে ঠ্যাং দুলিয়ে মধুছন্দার স্বপ্নের রাজকুমার সনৎরঞ্জন সমাদ্দার মসজিদ মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন ।  আজ মধুছন্দা একা, সাহসী রাজকন্যা । এই প্রথম সনৎরঞ্জনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন  মধুছন্দা । তার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, লজ্জাও ঘিরেছে তার বক্ষ । খানিকক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, আশেপাশের শ্যামল, বায়ু, আকাশ তাকিয়ে সেই যুগলমিলন দেখলো । এক অনন্ত আকর্ষণের কাছে এসে ধরা পড়েছে দুটি মেরু । দুটি সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য পদ, দুজনকেই চায় । এখানে প্রেমভাবকে যদি এক্স এক্সিস বরাবার প্লট করা যায়, দুজনই পজিটিভ । আবার সম্পর্ককে যদি ওয়াই এক্সিস বরাবর প্লট করা যায় । দুজনই পজিটিভ । দূরত্বের হিসাবে, দুজনই একই দিক কোয়াড্রেনে (১) অবস্থান করছেন ।  হিরোহোন্ডা এক্সট্রিমের পিলিয়ন রাইডার হিসাবে মধুছন্দার আজ প্রথম অভিজ্ঞতা । বুক কেঁপে ওঠে  তার । পিছনের সিটে বসিয়ে মধুছন্দাকে বসিয়ে উল্লাসে থরথর পক্ষীরাজের ঘোড়া উডিয়ে দিলেন রাজকুমার সনৎরঞ্জন । রাস্তার উপর যেন রঙ্গীন ফুল বিছিয়ে দিয়েছে কেউ , শানাই বাজছে যেন রাস্তার দুপাশে । স্বপ্নরাজ্যের সুবাস এসে মৃদুমন্দে আঘাত করে করে চলেছে নাসিকারন্ধ্র । মরানদীর সোঁতায় এসে একটা নৌকা বাঁধা আছে । বাইকটি পার্কিংএ রেখে যুগোলকিশোর সেই নৌকাভ্রমণে দ্রুতই পৌঁছালেন মরা নদীর চরে । পরিপার্শ্বে কোন মনুষ্য-প্রজাতির দেখা নেই । এই নির্জনে তবু নদীর ভাঙ্গন স্পষ্ট দেখা যায় । নদীর এপার ভাঙ্গে তো ওপারে চর জেগে ওঠে । এইখানটা পরস্পরের চোখে চোখ ডুবিয়ে অনন্ত বসা যায় দুজনে । হাতের মুঠোতে ধরে রাখা মধুছন্দার হাত নিয়ে সনৎরঞ্জন নদীর বাঁধের কিনারায় চলে আসেন । নদীর প্রতিচ্ছবি মধুছন্দার চোখের ভিতর ঝিলিক মেরে ওঠে । পায়ের নিচে নরম মাটি , এখনো পাড় শুকায়নি ভালো করে । টাল সামাল দেওয়া কঠিন ।  সনৎরঞ্জন খিলাড়ি মানুষ । সুঠাম শরীর, যেমন বাইসেপস, তেমন ট্রাই সেপস । বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরেন মধুছন্দাকে । প্রথম ডেটেই এতটা শারীরিক হয়ে ওঠা আশা করেননি মধুছন্দা । তবু,এই এত নিকটে আসাতে তার নিজের সম্মতি রয়েছে। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠার আগে, তার কিছু প্রশ্নের জিজ্ঞাসার তাই এখুনিই প্রয়োজন ।  কথাগুলি জিজ্ঞাসা করা যাক ।

"যে কথা তোমার বলার ছিলো, কিছু বলো " - বললেন মধুছন্দা ।
"কি কথা ? " - বললেন সনৎরঞ্জন ।
"ঐ যে গতকাল কলতলায় বললে, যে কারণে আমায় এখানে ডেকেছো " - বললেন মধুছন্দা । 
"এইযে দেখেছো কাঁচা মাটি, এখানে আমাদের গ্রাম ছিলো , আমাদের পরিবার, তোমাদের পরিবার । সবটাই নদীর পেটে, আমরা এই গ্রামে জন্মেছি, গ্রামটা ভেঙে গেছে " - বললেন সনৎরঞ্জন ।
"না , এ কথা না ।  আমার  পথ আটকে তুমি যেকথাটা গতকাল বলেছিলে , নাকি একটা কথা আছে " - বললেন মধুছন্দা ।
"হ্যাঁ সেটাই তো বলছি, আমার ঠাকুরদা ছিলেন গ্রামের মোড়ল, তোমার ঠাকুরদার বন্ধুস্থানীয়, খুব নিকটের । দুই প্রজন্ম আগে আমরা নিকটে ছিলাম, এক প্রজন্ম আগে আমরা দূরে চলে যাই "- সনৎরঞ্জন বললেন ।
"আচ্ছা, সোজাসুজি,  একটা কথা বলো । তুমি কি আমায় ভালোবাসো, তিন সত্যি করে বলো ।  কি ভালোবাসো ? " - জিজ্ঞাসা বললেন মধুছন্দা ।
"হ্যা, অবশ্যই ।  খুবই ভালোবাসি । এই আকাশ, এই নদী, এই চর সাক্ষী,  আই লাভ ইউউউ " - দুহাত উঁচু করে বললেন সনৎরঞ্জন ।
"কতোটা ভালোবাসো " - চমকিত চোখে যেন বারিধারা চলে আসে । উত্তাল বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করে উঠলেন মধুছন্দা ।
"এই  এত্তোটা "  বলে সনৎরঞ্জন দুহাত বাড়িয়ে দেখালেন ।

তারপর মধুছন্দাকে ধরে উঁচু করে কোলের উপর তুলে নিলেন । মধুছন্দার মুখের মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন মুখ । বুকের ভিতর পিষে দিলেন বুক । মধুছন্দা বুঝতে পারছেন । পায়ের নিচে মাটি কাঁচা, পা সরে যাচ্ছে । ভেঙে যাচ্ছে মাটি । সনৎরঞ্জনের বুকের ভিতর একটা আশ্রয় আছে । তাকে আসতে হচ্ছে তার বুকের ভিতরে । আসাটা এতো সহসা ও জরুরী ছিলো না, সেটা তার চাওয়াও ছিলো না ।  এইতো চিরাচরিত জনশ্রুতি । যৌবনের জোয়ারে নদীর পার ভেসে যায় ।  মধুছন্দা নিজেও উজাড় হয়ে গেলেন । বুভুক্ষু সনৎরঞ্জনের কামনার তাপে মধুছন্দার দুপুর পুড়ে গেলো । সনৎরঞ্জন তাকে কতোটা ভালোবাসেন , তার একটা পরিমাপ করার চেষ্টা করছিলেন মধুছন্দা । গ্রাম,সেন্টিমিটার,তারিখ যা কিছু পরিমাপ যোগ্য, তার মাত্রায় ।   ভালোবাসার আকার , আয়তন , রং , রস, ঘ্রাণ কিছুই যার সংজ্ঞাবদ্ধ নয়, কি ভাবে সেই সম্পর্ককে পরিমাপ করা যায় ? কতটা ভালোবাসা হলে অবলীলায় আত্মসমর্পণ করা যায় ? এক্স এক্সিস যত কাছে আসুক, ওয়াই এক্সিসের একটা দূরত্বে পড়েছে।  মধুছন্দা একটি স্ট্যান্ড নিয়ে ফেললেন মনে মনে ।  বিষণ্ণ বিকেল ফুরানোর আগে  তিনি ফিরে এলেন জিরো জিরোতে । যেখানে এক্স , ওয়াই আয়নহীন ভাবে নিরপেক্ষ  । অর্থাৎ নিজ আলয়ে ।   

পৃথিবীর সব পাখি ঘরে আসে । মধুছন্দাও এলেন ।  'মেয়ে দেখা'র অভিপ্রায়ে আসা অতিথিগণ এখনো তাদের বাড়িতে অবস্থান করছেন । অতিথিগণ কোয়াড্রেন-২ থেকে এসেছেন ।  কনে'কে তারা দেখেই যাবেন । কনে'র আসতে দেরী হচ্ছে বলে , তারা অপেক্ষা করলেন । মধুছন্দা সাহসী নারী, কিন্তু আজ  একটা চোরা ভাঙ্গন তার ভিতরে দেখা গেলো । তিনি  ভাঙ্গছেন, তবু ভেঙে পড়ছেন না । মলিন সালোয়ার, কামিজ ওড়না পালটিয়ে ,বাথরুম থেকে স্নান সেরে , অতিথিদের সামনে আসার জন্য প্রস্তুত হলেন । একটা রিং বাজলো । ফোনে একটা নোটিফিকেশন ঢুকলো । মেসেঞ্জার খুলে দেখলেন তিনি । সনৎরঞ্জন , মধুছন্দা ও তার যুগলমিলনের একটি সেলফি পাঠিয়েছেন । নিচে লিখেছেন । "আই লাভ ইউ, লাভ ইউ ভেরি মাচ" । মধুছন্দা একটি লম্বা নিঃশ্বাস নিলেন । কিছু ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ এলো । মেসেজটি ডিলিট করে মধুছন্দা ফোন অফ করে দিলেন । ডিলিটের নীচে যদিও রয়ে গেল একটা দাগ । দাগ, আচ্ছে হে।  অতিথিদের অনেকক্ষণ নিশ্চয় আটকে রাখা হয়েছে । তাদেরকে একবার দেখা দেবার দরকার ।

চা, নাস্তা হয়ে গেছে একপাটি । গল্প জুড়ে দিয়েছেন অতিথিগণ । দু-পরিবারে লোকজনই জমে গেছেন । এ পর্যায়ে কোয়াড্রেন-২ তে থাকা অতিথিদের কেউ নিশ্চয় তিনি এক্স পজিটিভ নন । কিন্তু তারা ওয়াই নেগেটিভও নন । এতক্ষণে মধুছন্দা বুঝে গেছেন,  নিকট মানেই এক্স এক্সিস নয় । সময়ের সমতলে, এক্সিস নিজেই বদলে যায় । আশ্চার্য,  দেখতে আসা মানুষটিকেও মধুছন্দা চিনতে পারলেন ।  তিনি আর কেউ নন স্বয়ং  বেনীমাধব ভট্টাচার্য । মধুছন্দা নির্দ্বিধায় তার নিকটে এসে পড়লেন । সেখানে কবি বেনীমাধব তাকে ভালোবাসেন কি না, কতো পরিমাণ ভালোবাসেন সেই প্রশ্ন অবান্তর ।

গল্পটি, এখানেই শেষ করা যেতো ।  ভালোবাসার বা নিকটে আসার পরিমাপ যোগ্য কোন ইউনিটের সন্ধান এইগল্পের চরিত্র দিতে পারলো না ।  কিন্তু ভাঙ্গন যে একটি সত্য তা উপলব্ধি করলাম । দাগের অস্তিত্ব নিয়েও আমরা ধারনা পেলাম । দাগ নিয়ে আমাদের কোন বিতর্ক নেই । কিন্তু একটি দাগকে লিপিবদ্ধ করা একটা কঠিন সমীকরণ । দাগ শুধুমাত্র ভেঙে যাওয়ার চিহ্ন নয় । দাগ হতে পারে জোড়া লাগারও । অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে যেটা এক্স এক্সিসে দূরত্ব মনে হচ্ছিলো, সেটা ওয়াই এক্সিসে নিকটে চলে আসতেই পারে । অ্যাসিমেট্রিক ইউনিট ।  এক অন্য ডাইমেনশনে ।  সেইভাবে, নিকটে আসা মানেই নিকটে নয় । বুকের ধকধককে তাই আর সংজ্ঞাবদ্ধ করা যাচ্ছে না । অথচ দুটি সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য পদের দূরত্ব নিয়ে যদি ভাবি , ক্রমবর্ধমান দুটিরেখার বিপ্রতীপ কোণে অবস্থান করছে চারটি কোয়াড্রান । সমমাত্রার পজিটিভ ও  সমমাত্রা নেগেটিভ স্বভবতই কাছে চলে আসে ।
সেই পরিণাম নিয়ে  তুমিও একগাছা দড়ি নিয়ে অশ্বত্থের কাছে গেছো ।  সে প্রতিবাদ করেছে তবুও আকাশচুম্বনকে ধরতে পারো নি ।  বিশ্বাস করোনি তাকে।  চুম্বনকে এক্স এক্সিসে ধরে যতই নিকটে আসতে চেয়েছো,  ওয়াই এক্সিস বরাবর ততটাই  আকাশ দূরত্বে সরে গেছে  । গণিতের সত্য হিসাবে দায়ী হতেই পারে একটি মাত্র ভাঙন, একই এক্সিসে একই দূরত্বে থেকেও মধুছন্দার কোঅর্ডিনেটে সনৎরঞ্জন নেগেটিভ হয়ে গেছিলেন । আর একটি দাগ হয়ে যেতে পারে জোড়া লাগার চিহ্ন । আপেল কে পেয়ারা দিয়ে যদিও কোনদিন বিভাজ্য করা যায় নি তবুও কোয়াড্রেন-১ থেকে নিজেকে কোয়াড্রেন-৪এ চলে যেতে দেখলেন সনৎরঞ্জন সমাদ্দার ।

এতকিছু সত্বেও, আর একটি প্রভাত আসে । ফেসবুকে নোটিফিকেশন আসতে থাকে । ফেসবুকে নোটিফিকেশন এসেছে,  সাগরিকা ঘোষকে ট্যাগ করে পোস্ট দিয়েছেন মধুছন্দা সেনগুপ্তা ।  দুই পরিবারের মিলনের কিছু ছবিসহ দেওয়া হয়েছে বেণীমাধব ও মধুছন্দার আসন্ন পরিণয়ের আগাম সংবাদ । ফেসবুক একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া । এখানে কে সত্য, কে সাহসী, কে লোভী , কে ধূর্ত এই নিয়ে কানাঘুষো ঘমাসান জারী থাকে। অশ্বত্থের শাখা এতটা বিশ্বস্ত নাও হতে পার ।  তার বিশ্বাসও হতে পারে ভঙ্গুর । কত আর সে প্রতিবাদ করবে ।  এইজীবন তার বেনীমাধব ছাড়া মিথ্যা জানা সত্বেও সাগরিকার জীবন থেকে বেনীমাধবকে এক ঝটকায় মধুছন্দা আলাদা করে দিলেন । ফেসবুকে তার এনগেজমেন্টের পাবলিক ঘোষণা দিয়ে সাগরিকার কল্পনার বাসরশয্যায় ঢেলে দিলেন শীতলজল । এই পিতামাতার অভাবী সংসারে সেলাই দিদিমণি সাগরিকা ঘোষ কি আর করতে পারেন ?  যে সাগরিকা এই গেমের প্রথম  থেকেই কোয়াড্রেন-২ এ অবস্থান করছিলেন, ফেসবুকের এক পোস্টেই কোয়াড্রন-৩এ পিছলে গেলেন । অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয়, আরো এক বিপন্ন বিস্ময় । একটি অজানা ভাঙনে হটাৎ তার ওয়াই এক্সিস নেগেটিভ হয়ে গেলো ।  এক্স এক্সিস আগেই নেগেটিভ ছিলো তার । এই নষ্ট মেয়ের ভূমিকায় কবিতা লিখতে অসহ্য লাগছে আজ । অক্ষরবৃত্তের শব্দাবলী থেকে যেন তার মাত্রা পতিত হচ্ছে । তার কবিতা মিলছে না ।  কোয়াড্রেন-৩ এক পৈশাচিক ভিরানা ।  ডিপ্রেশনের কোয়াড্রেন । সেখানে সবাই সবার থেকে দূরে অবস্থান করেন । একলা হয়ে যাওয়ার আগে বিপর্যস্ত চোখের সামনে তার পরিত্রাতার ভূমিকায় আচমকাই যেন বলিউড হিরো সুশান্ত সিং রাজপুত এসে দাঁড়ালেন । সাগরিকা ঘোষ তার চোখে চোখ রাখলেন । একটা প্রশান্তি ।  লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলেন ।  একটা চেয়ার টেনে নিয়ে , একগাছা দড়ি নিলেন হাতে ।  সিলিং ফ্যানের কাছে তার ছিলো এই শেষ নিবেদন । ঝুলে পড়লেন সাগরিকা ঘোষ । এই কবিতা জীবনের মোহ ভেঙে অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি দিলেন সাগরিকা ঘোষ । রেখে গেলেন একটি দাগ ।  যে দাগ না জোড়ার, যে দাগ না ভাঙার । পরিমাপযোগ্যতার বাইরে বিষাদবিধুর সেই দাগ ।