মনিকাঞ্চনমালা
--পীযূষকান্তি বিশ্বাস
বার তিনেক অসফল প্রয়াসের পর জয়েন্ট এন্ট্রান্স টেস্টে বসা ছেড়ে দিলো
শ্রীকান্ত । শ্রী শ্রীকান্ত লাহিড়ী । বছর আঠারোর সুঠাম দিল্লি কে কড়ক লন্ডা ।
প্রতিদিন দৌড়ে যাওয়া এই মর্মর দিল্লির বুকে রাফ এন্ড টাফ জীবনযাত্রা, প্রতিযোগিতার উচ্চ শিখরে পৌঁছাবার অনন্য রাস্তা হলো ভালো কলেজ থেকে
ইঞ্জিনিয়ারিং করা । তা হলো না । এই মেট্রোলাইফে প্রতিপদে এক সংগ্রাম, প্রতিদিনই এক নতুন মনখারাপ । যেকোনো মুহূর্তে আপন চিত্তের থেকে
যাপনের ছন্দ কেটে যাবে । যদি না আপনি বিত্তশালী হন । শাহজানাবাদ দিল্লি শহরে মাতুল
শ্রী অভিজিৎ দোস্তিদার মস্ত বড় সফল সিভিল
আর্কিটেক্ট । তার বাড়িতেই মানুষ শ্রীকান্ত।
এই জয়েন্ট এন্ট্রাস ব্যাপারটা বড় গোলমেলে । প্লাস-টুতে অনেক নাম্বার
নিয়েও উতরানো সম্ভব হয়ে ওঠে না । ফ্রাস্ট্রেশন আসে । ব্যর্থতার পদে পদে মিশে থাকে
গ্লানি, কৈশোর যেন পার হতেই চায় না । এদিকে গলিতে গলিতে
কোচিং সেন্টার, আকাশ , অক্সফোর্ড, অমুকদাদা, তমুক দাদার অনেক অনেক টিউশনি ক্লাস খুলে গেছে । সে
সব অনেক অনেক খরচা , বাবার কাছে টাকা চাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা । মামাকেও
বলে উঠতে পারেনি । মনে মনে সে ভেবেই নিয়েছে এই পর্যন্তই তার দৌড় ।
ক্লাস শেষ করে এবার নিজের ক্লাসে ফিরে যাবার দিন । মনেপ্রাণে আজকাল সে একটা চাকরীর কথাই ভাবছে । মোটামুটি একটা চাকরী পেলে সে আলাদা
ভাড়াঘর নিয়ে চলে যাবে । গ্রাম থেকে বাবাকে নিয়ে এসে কাছে থাকবে । বাবা গ্রামে একা
হয়ে গেছেন আজকাল । শ্রীকান্ত যখন প্রাইমারী
স্কুলে, মায়ের অকাল মৃত্যুতে পিতা পরেশনাথ লাহিড়ী পুত্রকে
মানুষ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, নিঃসন্তান মামী রত্না দোস্তিদার লাহিড়ী শ্রীকান্তকে নিজের ছেলে মতো আপন করে নেন
। মাতুল, অভিজিৎ দোস্তিদার শ্রীকান্তকেও স্কুলে
ভর্তি করে দিলেন । পরেশনাথ লাহিড়ী আর বিবাহ করলেন না । হাসনাবাদের এক স্কুলে
শিক্ষকতা করতেন । শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়ে এখন ফুলটাইম সাহিত্যচর্চা
করেন । কবিতা লেখেন । শিল্পী মানুষ । তার কিছু বই বেরিয়েছে, পাঠকও আছে । কিন্তু ওনার শরীর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছে না । ব্লাড
প্রেশার ও সুগারটা মাত্রারিক্ত বাড়ন্ত ।
শ্রীকান্ত ভাবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে । প্লেন গ্রাজুয়েট নিয়ে কি করা যায় ? । সরকারী চাকরীর কথা ভাবে শ্রীকান্ত । এদিক ওদিক ইন্টারভিউ দিয়ে
বেড়াচ্ছে । বন্ধুরা কিছু না কিছু করছে । দাঁড়িয়েও যাচ্ছে । এই তো রবিপ্রসাদ
সাক্সেনা এবছর ব্যাংক পিও হয়ে দেরাদুন চলে গিয়েছে । বান্টু সিং ওর কাছের বন্ধু ।
ওরও মার্চেন্ট নেভি হয়ে গেলো এ বছর । দীপিকা মালহোত্রা বি এড করছে । বেশ সুন্দর
দেখতে । বেশ পছন্দ হয় তাকে ।
কয়েকবার ডেট করেছে ।
বুদ্ধাগার্ডেন , লোধীগার্ডেন, পুরানাকিলায় বেশ ঘোরাঘুরি
করেছে । যার চাকরী নেই তার একটা গার্লফ্রেণ্ড আছে , জিনিসটা ঠিক খোদার ও পছন্দ
না । যে কোন সময় ছুটে যেতে পারে ছোকরি ।
শ্রীকান্ত ভাবে তার জীবন কাহিনী নিয়ে । দীপিকাকে নিয়ে কি করা যায় ? আচমকা পিওন একদিন একটা লম্বা খামে চিঠি দিয়ে গেলো । খুলে দেখে অবাক !
অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ! যোধপুরে আরকিওলজি ডিপার্টমেন্টে ওর চাকরী হয়ে গেছে । ঘর
বাঁধার স্বপ্ন দেখলো শ্রীকান্ত । খুশীর জোয়ার তার চোখে মুখে । মামা অভিজিৎ দোস্তিদার
কে দেখালো চিঠিটা । উনি গম্ভীর সুরে বললেন, 'ঠিক আছে' । মামা আশা করেছিলেন ভাগ্নে মস্ত বড় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হবেন । বাবার সঙ্গেও ফোন কথা বললো শ্রীকান্ত । বাবা খুবই উচ্ছ্বসিত । ফোনেই
কেঁদে ফেলল । ছেলের জন্য কিছু একটা না করতে পারার তাড়নায় পরেশনাথ লাহিড়ীর বহু
কেঁদেছে, চোখে জল আসেনি । আজ ফুঁপিয়ে কাদলো বাবা । সেতো
ছেলের কাছেই থাকতে চায় । সারা জীবন কিছু দিয়ে যেতে পারলো না, তার সাহিত্যকর্মের কিছুটা উত্তরাধিকারী হিসাবে ছেলেকে দিয়ে যেতে চায়
। যদি কোনদিন শ্রীকান্ত তার বাবার সাহিত্য কর্মের কিছুটা আঁচ পায়, জীবন তার সার্থক মনে হবে । এমনিতেই আজকাল আর কবিদের কেউ ডাকে খোঁজে
না । ছেলের কাছে থাকতে পারবে বলে পরেশনাথ লাহিড়ী মনে মনে একটু স্বস্তি পায় । পরেশনাথ
লাহিড়ী চেয়েছিলেন ছেলে মস্ত একজন আর্টিস্ট হোক , একটু শিল্পী মনের হোক ।
সেই রকম পাকাপাকি ভাবে যোধপুরে চলে এলো শ্রীকান্ত । সরকারী চাকরী । কাজে সে ভালো । মন লাগিয়ে কাজ করে । কাজের জন্য তাকে বিভিন্ন
মনুমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, ঐতিহাসিক স্পটে যেতে হয়
মেহরানগড় ফোর্ট রাঠোড়দের রাজ্য ,
ফুল মহল, তু্রজি কা ঝালারা
। অনেক বিদেশী গুণাগ্রহীদের
সঙ্গে রাজপুতনার ইতিহাস নিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয় । ভারতীয় শিল্প ও ভাষ্কর্ষের নানা
দিক হাইলাইট করতে হয়, কিভাবে প্রত্যেকটা ছবি বা মনুমেন্ট কিভাবে ভারতীয়
হয়ে উঠেছে সেই নিয়ে নানান যুক্তি সে খাঁড়া করে । এখন নানান বিষয়ে থিসিস লিখতে
হচ্ছে । নানান দেশ থেকে ডেলিগেটস আসে । সবাই ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল শিল্পের
গুনাগ্রাহী । এই সমস্ত নিয়ে খুবই একঘেয়েমী । কিন্তু প্রতিদিন সেই এক কাজ, এক কথা, মনে মনে শ্রীকান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে । এই ঐতিহাসিক শহর তাকে মূর্তির
মতই স্থবির করে দিয়েছে । যান্ত্রিক বানিয়ে দিয়েছে তার চেতনা । কোন কিলা, কোন মকবুরা যেন নিরেট পাথর ছাড়া আর কিছু না । আলো
আছে , ক্যামেরা আছে, ডলার ভ্যালু আছে, প্রাণ নেই কোথাও । এই এতসব দিনরাত বকবকের মাঝে তার কোন শিল্প নজরে
আসে না, মনে হইয় কোথাও যেন কিছু একটা মিসিং । দিন কে দিন
দায়িত্ব বেড়ে যায় কিন্তু কোথাও যেন মনে হয় এখানেও মন লাগছে না । কাজকর্মের ভিতর সে
ডুবে যেতে চায় আজকাল । প্রাচ্যের স্থাপত্য নিয়ে নতুন পেপার লিখতে হবে । রাতজুড়ে
শ্রীকান্ত ইতিহাসের পাতা জুড়ে দৌড়ে বেড়ায় । বাবার ফোন আসে । বাবাকে ফোন করে, মামীর ফোন আসে । সময়মত খেয়ে নেওয়ার কথা বলে । কুশল বিনিময় হয় ।
শ্রীকান্ত জানায় যে সে ভালো আছে । কিন্তু প্রতিদিন ওই একই কথাবার্তা চলতে থাকে ।
সমস্তটাই স্টিরিওটাইপের । বান্টুর ফোনও কম আসে । দীপিকার ফোন আসে না আর । ফেসবুকে
আপডেট দিয়েছে। তার একজন পাঞ্জাবী প্রেমিক জুটেছে । কদিন হলো ফোনে ফোনেই ব্রেক-আপ
হয়ে গেলো । দীপিকার মধ্যে ওর মাকে কিছুটা খুঁজে পেতো শ্রীকান্ত । জীবন থেকে তার
মায়ের ছোঁয়া এই মুহূর্তে অবলুপ্ত হয়ে গেলো । এই প্রথম মনে হলো শ্রীকান্তের জীবনটা
বড়ই একটা শূন্য । ব্যর্থ হতে হতে সে যেন একটা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।
সেদিন রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় । তার ছোটবেলার
কথা মনে পড়ে । হয়তো মার কথাই সে ভাবছিলো । অথবা কোন স্বপ্নের কথা । মোবাইল তুলে
বাবাকে ফোন করলো । বাবা ফোন তুললেন না । ফোন বেজে গেলো । ঘণ্টা খানেক পরেই বড়
মামার কল এলো । দুঃসংবাদ । বাবা পরেশনাথ লাহিড়ী আর পৃথিবীতে নেই । কি করতে হবে জানা নেই, হতভম্ব হয়ে গেলো শ্রীকান্ত ।
ভোরের ফ্লাইটেই কলকাতা চলল শ্রীকান্ত । হিসাব তো কিছু নেই, কি মিলছে ,কি মিলবে । মামা মামীও কিছুক্ষণ পরে কলকাতা
পৌঁছাবে । হাসনাবাদে পৌঁছে গেলো শ্রীকান্ত, চেনা পরিচিত লোকজন কিঞ্চিৎ, দিল্লিতে মানুষ হবার
কারণে বাল্যবন্ধুও কেউ এখানে নেই । বাবা দোতলায় একা থাকতেন । ম্যাসিভ হার্ট এটাক । হাসপাতালে যাওয়ার
সময় পায় নি পরেশনাথ লাহিড়ী । চারিদিকে বই খাতা ছড়ানো । লেখালেখি করছিলেন হয়তো । এই
বছর তার একটি কবিতার বই বেরোনোর কথা ছিলো । সাহিত্য চর্চা করতেন , পাড়ায় এদিক ওদিক মানুষকে ধরে কবিতা শোনাতেন । বুকস্টলে বসে, বুড়ীর চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিয়ে হাসিমুখে তার দিন কাটতো । আজ একা পড়ে আছেন । মানুষতো একাই আসে, একাই যায় । শ্রীকান্ত কিছু
ভাবতে পারলেন না । ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন । চোখে জল এলো না । কতবার সে বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছে, বাবাই মানা করে দিয়েছে । তাকে
বড় হতে হবে, মামার কথা মতো চলতে হবে । আজ তার কেন যেন মনে হলো
এই সংসার সম্পূর্ণটাই তার জন্য মৃত । এই মনুষ্য জীবন তার পুরোপুরি অনর্থক । ব্যর্থ
জীবনের এই ভার তার চরম অসহ্য বোধ হতে লাগলো । চোখে কোন জলই এলো না । হতভম্বের মত
সে চোখে অনুভব করলো জলশূন্যতা ।
শ্রাদ্ধের কাজকর্ম সেরে যোধপুর ফিরে এলেন শ্রীকান্ত । ইদানীং কাজের
চাপ কম । আকবরের মকবুরায় ঐ কৃষ্ণা দ্বাদশীর চাঁদ দেখা যায় । পাশে ছোট বড় উজ্জ্বল ও
অনুজ্জ্বল নক্ষত্র । কাজে মন লাগে না আর । এই শহর, এই ভাষ্কর্ষ , চিত্র, মনুমেন্ট থেকে দূরে যেতে চায় । মনে হয় হাসনাবাদের
দিকে চলে যায় । অফিসের বড় বাবুও বলছিলেন 'শ্রীকান্ত্জী আপ এক লম্বা
ছুট্টি লে লিজিয়ে' । কিন্তু আসলে সে হাসনাবাদের দিকেও যেতে চায় না ।
বাবার চিতার ছবির সামনে সে বারবার এসে দাঁড়াতে চায় না । কিন্তু ছুটিতো নেওয়াই যায়
। গুগলে ম্যাপ দেখে ঠিক করলেন কোন নির্জন জায়গায় যাবেন যেখানে খানিকটা একা হওয়া
যায় । সৃষ্টিকর্তা যেখানে ব্যস্ত নন । কিছু প্রশ্ন তাকে রাখা যায় । অবসরে নিজের
হারানো পরিবারের ব্যথায় কিছুটা কান্না করা যায় । কিছুতেই চোখে জল আসে না । মরুভূমি
, সমতল, সমুদ্র থেকে তার পাহাড়ি
এলাকা পছন্দ হলো । এমনিতে ধর্ম চর্চা বা মন্দিরে বেশী তার নেই তা স্বত্বেও আজ কেন
জানি তার মনে হলো হিমালয়ের কোলে কোন মন্দিরে গিয়ে দুদিন কাটায় ।
সেই মত ইন্টারনেট খুঁজে সে হিমাচল প্রদেশের টিকিট কেটে ফেলল । জায়গা
হিসাবে ঠাণ্ডা ও নির্জন সে 'কাজা' শহরে এসে একটা মোটামুটি
হোটেলে ঘর নিলো । কাজা একটা পাহাড়ি গ্রাম, লাহুল ও স্পীতি জেলায় ।
সপ্তাহ খানেক এখানেই থাকতে চায় শ্রীকান্ত । এখানে জানতে পারলো কিছু বৌদ্ধ
মনেস্ট্রি আছে , খুব শান্ত ও নির্জন পরিবেশ ।
যাত্রা হিসাবে এই প্রথম নয়, তবুও ঘুরতে যাওয়া হয়তো এই
প্রথম । এবং একা । বন্ধু বান্ধব পরিজন বর্জিত। এই প্রথম
উদ্দেশ্যহীনতাকে সে অনুভব করলো শ্রীকান্ত । জীবনের ধুকপুক কে সে তার বুকের খুব
কাছে টের পেলো, এই প্রথম সে বুঝতে পারলো শিরশিরে ঠাণ্ডা বাতাস তার
জামার আস্তিনে ঢুকে যাচ্ছে । চোখজুড়ে জলশূন্যতা আর পায়ে পাহাড়ির গ্রামের ডাক । একে
একে পাহাড় পেরিয়ে যাচ্ছে, সবুজের প্রলেপ করে দিগন্ত শেষ হয়ে আসছে । চারিদিকে
বরফের স্তূপ সরিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি চলেছে আর্মির ট্রাক । তিব্বতের দিকে
চলে যাচ্ছে ওরা । অনিশ্চয়তা ঘিরে আছে অসম্ভব স্থিরতা নিয়ে, স্বাভাবিকতা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে । মেঘহীন জীবন কারো জন্য অপেক্ষা
করেনা এখানে । হোটেল টাইগার ডেন ,
থ্রি স্টার । বেশ সাজানো
গোছানো । বুঝতে পারলো শ্রীকান্ত যে এখানে সে নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছে ।
কিন্তু যতটুকু নিঃশ্বাস সে নিচ্ছে তার এক শ-শতাংশ খাঁটি । সে এখানে প্রিয়জনের
বিয়োগ ভুলতে চায় , পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে খুঁজতে চায় । আবিষ্কার
করতে চায় জীবনের প্রাসঙ্গিকতা । আজ এখনো সূর্য অস্ত যেতে ঘণ্টা খানেক বাকি । হোটেল
থেকে বেরিয়ে খানিকটা ঘুরে আসতে চাইলো শ্রীকান্ত । কিছু খবরাখবর করতে চায় , কোথায় কাছাকাছি কি আছে চটজলদি জেনে নেওয়া ভালো । এখানে টুরিস্টদের
ভিড় । গ্রুপে এসেছে সবাই । দোকান পাঠে শহুরে মানুষদের ভিড় । শ্রীকান্তের পছন্দ
পাহাড়ি মানুষদের সাথে কথা বলা । স্থানীয়দের সাথে সে আলাপ করতে চায় ।
একটু খিদে পেয়েছে বুঝলো শ্রীকান্ত , এখানে খাদ্য বলতে ম্যাগীর
চলাচল । শুকনো খাবার । অনেকদিন জমিয়ে রাখা যায় । সেইখানে ম্যাগী খেতে খেতে
দোকানীকে জিজ্ঞাসা করলো দেখার কি কি আছে । দোকানীও জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনে নিলো কোথা
থেকে এসেছে, কোন হোটেলে উঠেছে । সেই মত তাকে অনেক জায়গা ও
কিভাবে যাওয়া যাবে তা জানিয়ে দিলো । পরামর্শ দিলো, একটা গাইড নিলে সে সমস্তটাই
ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে ।
হোটেল থেকে এমন একটা গাড়ি দিয়েছে । ড্রাইভার নিজেই গাইডের কাজ করবে ।
তার বাড়ি কাজাতেই । কাছাকাছিই তার গ্রাম । গ্রামের বাড়িতে রোজিরোজগারের তেমন
ব্যবস্থা নেই । টুরিস্টই ভরসা । বাইরে থেকে টুরিস্ট এলে তাদের জীবিকা চলে । শীতের
সময় বরফ জমে যায় , টুরিস্ট কম আসে । যেটুকু ইনকাম এই গরমের সময় ।
জিজ্ঞাসা করতে ড্রাইভার তার নাম জানালো রাজু । রাজকুমার ঠাকুর । সে মনিবের গাড়ি
চালায় ।
এই কদিন বেশ ঘোরাঘুরি হলো । নানান রকমের কথা, কাহিনী, রূপকথার দেশ এই কাজা । বেশ কেটে গেলো কয়েকটা দিন
রাজুর সহচর্যে । কাল দিল্লি ফিরে যাবে শ্রীকান্ত । এই কদিনে সে প্রকৃতির মাঝে
নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইছে, কিন্তু কেন জানি মনে হলো কিছুটা বাকি রয়ে গেল । আজ
তার জার্নির শেষ দিন । যাত্রা শুরু হলো ভোরে । সকালে কিছু খাওয়া হলো না । রাস্তায়
কোথাও খেয়ে নেবে স্থির করলো । সুনীল আকাশের নীচে এক বিশাল দেহ নিয়ে এক একটা পাহাড়
দাঁড়িয়ে আছে । স্পিতি নদীর মনোরম জলে এই প্রথম নিজের ছবি দেখতে পেলো শ্রীকান্ত ।
কি প্রশান্তি । তার কোন বন্ধু ,
পরিবার, সমাজের দরকার আছে কি ? সে নিজেই একটি সমাজ, নিজেই নিজের পরিবার,
নিজেই নিজের বন্ধু । নদীর
ঝরনায় পা ডুবিয়ে দিলো শ্রীকান্ত । প্রকৃতির মাঝে সে বুঝতে পারলো এক রহস্যময়তা ।
রাজু বলে চলল পাহাড়ের ইতিহাস ,
শহরের ইতিহাস , নদীর উৎসের কথা ,
বরফ ও জলের যুগলবন্দীর
কাহিনী । রাজু বলল । এখানে একটা বুদ্ধ মন্দির আছে । যাবেন কিনা । শ্রীকান্ত তো এখানেই যেতে চেয়েছিলো । কী মোনাস্ট্রি । পাহাড়ি গ্রামের
মাঝে মধ্যযুগের নানা স্থাপত্যের নিদর্শন দেখে চমৎকৃত হলো । তার মনে নানান জিজ্ঞাসা
। পেশার কারণে সে ইতিহাসকে জানা শুরু করেছে । আজ একটা জায়গায় দেখলো কয়েকটা বড় বড়
পাথর প্রায় একই আকৃতির, কেমন যেন কোথাও একটা সিমেট্রি আছে । একটা
প্যাটার্ন যেন বার বার রিপিট হচ্ছে । পাথরে
এমন একটা শিল্প নিদর্শন দেখে থমকে দাঁড়ালো । এই পাথর প্রাকৃতিক নয় । এই তো
শিল্পীমনের বহিঃপ্রকাশ । রাজুকে জিজ্ঞাসা করলো এই পাথর কোথা থেকে এলো ?
রাজুর এই সব স্থান নখদর্পণে । এখানেই তার জন্ম, এখানেই তার বেড়ে ওঠা । এখানকার গল্প কথা, পাহাড়ি কাহিনী শুনে শুনে ঘুম পাড়িয়েছে তার দাদীমারা । রাজু বলল, "কয়েক হাজার বছর আগে এখানে এক রাজা থাকতেন, এখানে গাছপালা ভরা ছিলো । অনেক জংগল ছিলো । রাজা খুব অত্যাচারী ছিলেন
। একদিন দুপুর বেলা । রাজার দশ বছরের মেয়ে মনিকাঞ্চনমালা নদীতে নুড়ি কুড়চ্ছিলেন ।
হঠাৎ বৃষ্টি । আকাশ ঘনকরে বিদ্যুৎ । বাজ-পড়ে এই জঙ্গলে আগুন লেগে যায় । পর্বতের
উপরে থাকতেন এক বুদ্ধ সন্ন্যাসী । তিনি বিপদ বুঝতে পেরে ওখান থেকে একটা বড় পাথর
ফেলে দেন । বরফের ঢল নেমে আসে । আগুন তো বুজে যায়, মানুষজন বেঁচে যান । কিন্তু
এই অবসরে রাজার মেয়ে মনিকাঞ্চনমালা বরফের প্রবাহে বিলীন হয়ে যায় । ওই পাহাড় থেকে
নেমে আসা এই পাথরগুলোকে খামোশ করে দেওয়ার জন্য রাজার নির্দেশে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে
ধরে নিয়ে আসা হয় । আর এই পাথরগুলো দিয়ে বন্দী বানানো হয় । সেই থেকে এই পাথরগুলো
কোথাও যায় নি " ।
রাজুর গল্প শেষ হয়,
কিন্তু নানান ভাবে মনের
এদিক ওদিকে প্রশ্ন জেগে ওঠে । রাজার কথা, ইতিহাসের কথা, ছোট্ট মেয়ের জীবন শংকার কথা, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কথা ।
ভাষ্কর্ষের দারুণ নিদর্শনগুলি কেন জানি নিষ্প্রাণ হয় । হয়তো তার ভিতর কোন দর্দ
খুঁজে পায়না শ্রীকান্ত । এই কয় বছরে চাকরী করতে করতে তার যোধপুরের সমস্ত
মনুমেন্টের সন, তারিখ, খরচা, সব ইতিহাসই তার মুখস্থ । রাজপুতানার রাজা মহারাজাদের শিল্প পরিচর্যার
সমস্ত ভূগোল তার মুখস্থ । সে বলে দিতে পারে সমস্ত হিসাব । এর ভাষ্কর্ষের মধ্যে সে
শিল্প খুঁজে পায় না । কোন দর্দ নেই, কোন কাহিনী তার হৃদয়ে কোন
করুণ রসের উদ্রেক করে না । আজ কেন জানি তার বুকের ভিতর প্রথম ধাক্কা এলো । শিল্পের
কোন এক ছোঁয়ার রং তার চিন্তা প্রদেশে লাগছে । ভাবতে থাকলো শ্রীকান্ত , এত বছর ইতিহাসের কথা, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কথা, রাজার হারিয়ে যাওয়া কন্যা মনিকাঞ্চনমালার কথা । ঈশ, সেই মেয়েটার কি হলো । ছোট্ট মেয়েটা দেখতে খুব রাজকন্যার মত ছিলো ।
ছিলো কি, ও তো রাজকন্যাই ছিলো । রূপকথা আর ইতিহাস অনেকটা এক, গল্পের মতোই । যতক্ষণ না তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, শ্রীকান্তের মনে সেটা শিল্পের ঝংকার বলে মনে হয় না ।
দুপুর গড়িয়ে পাহাড়ে বিকেল নামছে । গ্রাম জুড়ে অনেক মানুষ । ভাবা যায়
এখানে বছরের অর্ধেকটা সময় ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে ? রাজধানী থেকে বহুদূর এই গ্রাম । জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য একাডেমী,
দাদা সাহেব ফালকে, ফিল্ম ফেয়ার কোনদিন এখানে আলোচনা হয় না, এই সব গল্প এদের জানা নেই । পাহাড়ি জড়িবুটির আর দেশী ইলাজে দিব্বি
এদের দীর্ঘ শীতকাল কেটে যায় । গরম কাল আসে । বরফ গলে যায় । জীবন যাত্রায় বিদেশী
লোক ঢুকে পড়ে । ইকোনমি এই ভাবে চলে এদের । আজ ফিরে যাবার আগে শেষ দিন । রাজুর
সারাদিন কথা ও কাহিনী শুনে সে ক্লান্ত । পেটে একটু খিদের আঁচ পাচ্ছে । কিছু খাবার
পাওয়া যায় কিনা দেখা যাক । বিকেলের আলো আর কিছুক্ষণ পরেই মিলিয়ে যাবে । অন্ধকার
নামবে সারা পাহাড় জুড়ে । রাজুর দিকে তাকালো । হোটেলের কাছাকাছি এসে রাজুকে ছেড়ে
দিল । এইটুকু সে হেঁটে যাবে ।
সারাদিনের ঘটনার একটা সারাংশ তার মাথার মধ্যে ঘুরছে, সেইগুলোকে একটা আকার দিতে চায় শ্রীকান্ত । খিদেটা জ্বালাচ্ছে ।
রাস্তায় একটা চায়ের দোকান । ছোট টিন দিয়ে ঘেরা, গাছের গুড়ি দিয়ে বসার জায়গা
। বলল "চায়ে মিলেগা" ?
"মিলেগা সাব" জবাব এলো
দোকানদারের । ব্যাগটা নামিয়ে দাঁড়াল শ্রীকান্ত । হাতের ক্যামেরাটা অন করলো
শ্রীকান্ত । কিছু কিছু শট একবার চেক করে নেবে । চা দোকানকে লক্ষ্য করে ছবি তুলল ।
এই হয়তো এই যাত্রার শেষ ছবি,
এই প্রকৃতি আর শিল্পকলার
ভিতর পাহাড়ি জীবনযাত্রা একটা নতুন উৎসাহের দিক খুলে দিতে পারে । বাবার কথা মনে
আসছে শ্রীকান্তের । শিল্পী মানুষ ছিলেন । হয়তো এইখানে এলে কিছু নতুন কবিতা লিখতেন
। ভিতরে চা করছেন একজন পাহাড়ি মহিলা । বিকালের আলো এসে পড়েছে পাহাড়ের গায় । এখানে
কাস্টোমার বলতে শ্রীকান্ত একা । গরম চায়ের গন্ধ আসছে । চা রেডি । ট্রেতে কাপ
শুদ্ধু চা বসিয়ে একটা বছর দশেকের একটা মেয়ে এগিয়ে এলো । খালি পা, নাকে নথণী, পাহাড়ি মেয়ে, সাজপোশাক পাহাড়ি । বছর দশেক
হবে, কিংবা এগারো । প্রকৃতির কন্যা । তার হাত থেকে চা
টা হাতে তুলে নিয়ে শ্রীকান্ত
জিজ্ঞাসা করলো "ক্যা
নাম হে তুমহারা "? কোন ভাবনাচিন্তা ও আড়ষ্টতা না দেখিয়ে স্বাভাবিক
আওয়াজে মেয়েটি চোখ তুলে উত্তর স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর দিলো "মনিকাঞ্চনমালা" ।
ধপ করে বসে পড়লো শ্রীকান্ত । অ্যাঁ । কি শুনতে পাচ্ছে সে ? কোথাও যেন বাজ পড়লো । "মনিকাঞ্চনমালা" । শব্দটি উচ্চারণ হবার সংগে সংগে বারবার পাহাড়ে
পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে । কানের ভিতরে বারবার গুনগুণ করে উঠছে তার
আম্লপিফাইড ভার্সন । নিউরোনে অচানক একটা ঝড় । এই তো সেই হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যা ।
চায়ের প্লেট ধরে অপরূপ পাহাড়ি তনয়া তার সামনে এক অলীক দর্শনের উপলব্ধি । এ যেন
প্রাণের পরশ নিয়ে এলো অযুত খোঁজের সারাংশ । এ এক জীবন্ত প্রতিমা আর শাশ্বত রূপের
অবিসংবাদী মিথ । বুঝতে পারছে শ্রীকান্ত, তার মেরুদণ্ড দিয়ে প্রচণ্ড
বেগে লোহিত রক্তকণারা ছুটে চলেছে । অবারিত ঝর্নায় প্রবাহিত হচ্ছে স্পিতি নদীর
কুলুকুলু কলোধ্বনি । ক্লান্ত মুখের অভিব্যক্তি চঞ্চল, শ্রীকান্তের চোখে নরম হয়ে ভিজে আসছে কান্না । বাঁধ ভেঙে নামছে অশ্রুর বন্যা । মনিকাঞ্চনমালার মুখাবয়বে মধ্যে
শিল্পবোধের উচ্ছল ঢেউ, বাদামী চোখের সোনালী ধারায় পাহাড়ি বিকেল যেন
ঝকমকিয়ে উঠছে ।